“ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: এক বিস্ফোরণোন্মুখ বাস্তবতা”

২০২৫ সালের জুন। বিশ্ব যখন প্রযুক্তি বিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার ধোঁয়ার রেখা দেখা দিলো। ইসরায়েল ও ইরান—দুই রাষ্ট্র, যাদের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও শত্রুতা দিয়ে ঘেরা—অবশেষে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লো।

১৩ জুন ভোররাতে ইসরায়েল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ইরান পাল্টা আক্রমণে নামে‘অপারেশন ট্রু প্রমিস থ্রি’-এর আওতায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে।
যুদ্ধের সূত্রপাত হলো রাষ্ট্রের মধ্যে, কিন্তু ক্ষতবিক্ষত হলো মানুষ—যারা যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু যুদ্ধের আগুনেই পুড়ছে।

সংঘাতের অন্তরালের গাঢ় ছায়া:

এই সংঘাত কোনো হঠাৎ আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া নয়। এটি বহুদিনের জমে থাকা আস্থাহীনতা, কৌশলগত ভয় ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার বিস্ফোরণমাত্র।
ইসরায়েল বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে—ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্র তৈরির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পরমাণু সমঝোতা (JCPOA) ভেঙে যাওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে, ইরান নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার ও অঞ্চলগত নিরাপত্তার কথা বলে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল। সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াশীল হামলা বারবার সংঘাতকে উসকে দিয়েছে।

যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ:

রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক কৌশল, আন্তর্জাতিক সমীকরণ—সবকিছুর মাঝখানে পড়ে সবচেয়ে বেশি কাঁদে সাধারণ মানুষ।
তেহরান কিংবা তেলআবিবের রাস্তায় এখন আতঙ্কের ছায়া।
স্কুলে যেতে পারছে না শিশুরা, হাসপাতালে ঠাঁই নেই, খাদ্যসামগ্রীর দাম চড়ছে আকাশে।
একজন মা বাঙ্কারের ভেতর বাচ্চার কান ঢেকে রাখছেন যেন বাইরে বোমার শব্দ না পৌঁছায়। একজন বৃদ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করছেন, “আমরা কী অপরাধ করেছি?”
যুদ্ধে সৈন্যরা নিহত হয় বটে, কিন্তু পঙ্গু হয় সমাজ।
যে কৃষকটা জমিতে চাষ করছিল, আজ সে উদ্বাস্তু;
যে ট্যাক্সিচালক প্রতিদিন সকালে রুটি কিনতো, আজ তার ঘর ধ্বংসস্তূপ।
মানুষ—এই সভ্যতার স্তম্ভ—আজ নীরব, রক্তাক্ত এবং ভীত।

বাংলাদেশ ও মানবিক শঙ্কা:

বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত।
এই যুদ্ধের উত্তাপ তাদের ঘিরেও ভয় ছড়াচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা, চাকরি, জীবনযাত্রা আজ অনিশ্চিত।
অনেকে পরিবারকে দেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে, কেউ আবার আর্থিক সংকটে দেশে টাকা পাঠাতে পারছে না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত—তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এছাড়াও যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, খাদ্য আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুদ্ধ কি শুধুই রাষ্ট্রের?:

রাষ্ট্রগুলোর মাঝে শত্রুতা থাকলেও, দুই দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে কিন্তু এমন কোনো বিদ্বেষ নেই।
তেহরানের কবি যেমন ভালোবাসা নিয়ে কবিতা লেখেন, তেমনি তেলআবিবের শিল্পীও স্বপ্ন দেখেন শান্তির। তবে নেতারাই যখন আগুনে ঘি ঢালেন, তখন সেই আগুন নিভাতে হয় শিশুদের চোখের জল দিয়ে।
যখন একটি যুদ্ধ শুরু হয়, তখন রাষ্ট্র বিজয় পায় কিনা—তা ভবিষ্যতের প্রশ্ন;
কিন্তু মানুষ যে তৎক্ষণাৎ হেরে যায়—এটাই বাস্তবতা।

বোমার চেয়েও বড় শব্দ—”ক্ষমা”

একটি বোমা মুহূর্তেই প্রাণ নিতে পারে, একটি ড্রোন ধ্বংস করতে পারে শহর।
কিন্তু একটি ক্ষমা, একটি সমঝোতা, একটি কূটনৈতিক হাত মেলানো—তা পারে হাজারো প্রাণ বাঁচাতে, ভবিষ্যতকে রক্ষা করতে। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।
কিন্তু এই যুদ্ধের ফলাফল কী হবে—তা নির্ভর করছে এখনো কিছু মানুষ, কিছু রাষ্ট্র, কিছু সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর।
আমরা যারা কলম চালাই, যারা সংবাদ পড়ি, যারা কেবল মানুষ—আমরাও দায় এড়াতে পারি না।
আসুন, যুদ্ধের গল্প বদলাই।
যুদ্ধের ধোঁয়া নয়, শান্তির আলোয় আলোকিত হোক আমাদের পৃথিবী।
এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা, আমাদের প্রার্থনা।

✍️
জিয়াউদ্দিন লিটন
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট