“গণবিচার নয়, গণ-অবিচার: মব জাস্টিসে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ”

“চোর! চোর!”—এই ক্ষণিক চিৎকারে কী ঘটতে পারে তা আমরা জানি না, কিন্তু আমরা তার পরিণাম জানি। চোখের পলকে ঘিরে ফেলে একদল জনতা, একজনকে ধরে—পিটিয়ে মেরে ফেলে, এরপর জানা যায়, তিনি চোর ছিলেন না; মানসিক ভারসাম্যহীন বা পথচারি মাত্র। এটা বাংলাদেশের মব জাস্টিস বা গণআক্রোশে বিচার নামক ভয়ংকর বাস্তবতা, যেখানে আইন নেই, তদন্ত নেই, যুক্তি নেই—আছে শুধু ভয়, উন্মাদনা আর রক্ত।

আলোচনা শুরু করার আগে আমাদের জানতে হবে মব জাস্টিস (Mob Justice) বলতে বোঝায়। এটি এমন বিচার যেখানে জনগণ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেয় এবং কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী মনে করে শাস্তি দেয়। এটি বিচারবহির্ভূত, অনিয়ন্ত্রিত ও প্রায়শই সহিংস। আধুনিক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এটি এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে, যা শুধু আইনের শাসনকেই চ্যালেঞ্জ করছে না—বরং মানবিকতা ও নৈতিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে কমপক্ষে ৫৬ জন ব্যক্তি মব জাস্টিসে প্রাণ হারান।
শুধু ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত, ৩২টি ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন।


১৪ জুলাই ২০১৯, ঢাকার উত্তর বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেনু নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে “শিশু চোর” সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ভিডিও দেখে দেখা যায়, তিনি চোর নন, বরং স্কুলে মেয়ের ভর্তি তথ্য জানতে গিয়েছিলেন।
৩ মার্চ ২০২৫, ভাটারা এলাকায় দুই ইরানি নাগরিককে ছিনতাইকারী ভেবে স্থানীয় জনতা গণপিটুনি দেয়। ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে, কিন্তু এক ব্যক্তি মারাত্মক আহত হন।


অক্টোবর ২০২১, দিনাজপুরের বীরগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে “কুরআন অবমাননা” গুজবে মন্দিরে হামলা ও ব্যক্তিগত বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়াও নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, ও চট্টগ্রামের গ্রামীণ অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বহুজনের জীবন বিপন্ন হয়েছে।

মব জাস্টিস মানেই  আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা বৃদ্ধি।জনগণের হাতে বিচার তুলে নেওয়া মানেই তারা আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে। এটা রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত। মব জাস্টিসের কারণে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুল সন্দেহ বা পরিকল্পিত বিদ্বেষের কারণে নিরপরাধ ব্যক্তি প্রাণ হারান। এতে সমাজে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এতে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়। বিচারবিহীন শাস্তি, শারীরিক নির্যাতন, জনসম্মুখে অপমান ইত্যাদি মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে লঙ্ঘন করে।মব জাস্টিস সংঘবদ্ধ অপরাধকে উৎসাহ দেয়। গণপিটুনির পেছনে কখনো স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ইন্ধনও কাজ করে।

ডিজিটাল যুগে মব জাস্টিস আরও ভয়ানক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন, ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে “চোর ধরা পড়েছে” বা “শিশু চুরি হচ্ছে”—এমন গুজব মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই ভিডিও না দেখে, সত্যতা যাচাই না করেই দোষীকে ধরে ফেলে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মব জাস্টিসের ৭০% ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছিল। গুজব সৃষ্টিকারীরা নিজেরা দৃশ্যপটের বাইরে থাকে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হন নিরীহ পথচারী।

কিন্তু আইন কী বলে?
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির (১৮৬০) ৩০২ ধারা অনুযায়ী, “মারাত্মক আঘাতের মাধ্যমে কারো মৃত্যু ঘটানো হলে তা হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হবে এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।”
এছাড়া, ১৪৩/১৪৯ ধারায় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও বেআইনি জমায়েতের শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, এগুলো প্রয়োগ কতটুকু কার্যকর?

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া-তেও মব জাস্টিস প্রবল সমস্যা। তবে তাদের সরকার “Community Policing” ও “Fast-track Courts” চালু করে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমিয়েছে। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

আইন প্রয়োগকারীদের সক্রিয়তা ও নজিরমূলক শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। যারা মব জাস্টিসে অংশগ্রহণ করে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও গণমাধ্যমে মানবাধিকার, গুজব প্রতিরোধ ও সহনশীলতার বিষয়ে এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করতে হবে।মিথ্যা ভিডিও, পোস্ট, গুজব ছড়ানো চক্রকে শনাক্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নিতে সাইবার নজরদারি জোরদার করা উচিত।

৫ আগস্টের পরের অরাজকতার ছায়া
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন সেই উত্তেজনা একটি ভয়ংকর মোড় নেয়। অভিযোগ আছে, কিছু ছাত্র ও উত্তেজিত জনতা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বাড়ি ও কার্যালয়ে হামলা চালায়, জানালা ভাঙে, আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছু এলাকায় প্রশাসনের লোকজনের ওপরও হামলার খবর পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল, অভিযুক্তদের পরিচয় না জেনেই—মব জাস্টিসের পুরনো ধারায়—জনতা আইন তুলে নেয় নিজের হাতে। কাউকে “দালাল”, “প্রতারক” বা “সরকারের লোক” মনে করে মারধর করে বসে।
মামলাবাজি, উত্তেজনা আর আইনহীনতার সেই সময়টায়, মব জাস্টিস আবারো দেখিয়ে দেয় আমাদের সমাজ কতটা সহনশীলতা হারিয়েছে।

এ যেন এক ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি—সন্দেহ, রাগ আর উন্মাদনা মিলে গড়ে তোলে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যেখানে মানবাধিকার ও আইন একপ্রকার বিলুপ্ত।মব জাস্টিস আমাদের সমাজে বিচারবিহীন নিষ্ঠুরতার এক ভয়ানক রূপ। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে “ন্যায়বিচার” আদালতের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া উচিত, না যে কারও হাতুড়ির আঘাতে। পাঠকদের উদ্দেশে অনুরোধ: আপনি যদি কোথাও দেখেন—একটি সন্দেহ, একটি গুজব কারো প্রাণনাশ ঘটাতে চলেছে, দয়া করে মুখ খোলেন। মনে রাখবেন, নীরবতা অনেক সময় অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট