প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত : মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা

২১ জুলাই ২০২৫, দুপুর ১টা ১৮ মিনিট। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ডিয়াবাড়ি শাখা তখনো পাঠের ছন্দে ডুবে থাকা এক ভবিষ্যতের প্রতীক। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষকরা পাঠে, কেউ হয়তো উচ্চারণ করছিলেন—“জীবন মানেই সংগ্রাম।” ঠিক তখনই আকাশ চিরে নেমে এল একটি যুদ্ধবিমান—বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি Chengdu F-7 BGI প্রশিক্ষণ জেট। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে মুহূর্তেই ভস্মে পরিণত হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন, মৃত্যুগ্রস্ত হয়ে পড়ে শিক্ষকদের সম্মানিত জীবন।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে এটি কি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা? নাকি এটি অবহেলার আগুনে জ্বলতে থাকা রাষ্ট্রের এক নির্মম পরিণতি?

বিভিন্ন তথ্য থেকে যতদূর জানা যায় প্রশিক্ষণ বিমানটি ছিল চীন থেকে আমদানিকৃত Chengdu F-7 BGI সিরিজের উন্নত যুদ্ধবিমান, যা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সেবায় এসেছে ২০১৩ ও ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে। ২১ জুলাই ২০২৫ দুপুর ১টা ৬ মিনিটে বিমানটি কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম চেষ্টা করেছিলেন জনবহুল এলাকা এড়িয়ে খোলা জায়গায় অবতরণের, কিন্তু বিমানটি প্রথমে একটি পাঁচতলা ভবনে ধাক্কা মেরে দ্বিতীয় তলা ভবনে আছড়ে পড়ে। তখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। এভাবে শ্রেণিকক্ষে আগুন নামা, কতটা ভয়াবহ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

এ ঘটনায় ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে এখনো রয়েছে মতভেদ। মৃত্যুর তালিকার মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্কুলকর্মী অন্তর্ভুক্ত। তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায় গুরুতর আহত অবস্থায় অন্তত ১৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি, যাঁদের মধ্যে ৬০-৭০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের অধিকাংশই বার্ন ইনস্টিটিউট, সিএমএইচ এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়াও অন্যান্য হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন রয়েছে অনেকেই।

পাইলট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম প্রথমে জীবিত উদ্ধার হলেও, হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, “আমি চেষ্টা করেছি ভবনের ওপর না পড়তে, কিন্তু সময় ছিল না।” তাঁর আত্মত্যাগ জাতির জন্য এক মর্মন্তুদ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভিজ্ঞতায় এ ধরনের প্রশিক্ষণ-জেট দুর্ঘটনা নতুন নয়—গত দুই দশকে F‑7, Yak‑130, PT‑6, Mi‑17 বিভিন্ন এলাকায় বিধ্বস্ত হলেও গ্রাউন্ডে জনপ্রাণহানির ঘটনা এটাই প্রথম।
৯ মে ২০২৪ – YAK‑130 প্রশিক্ষণ জেট চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। স্কোয়াড্রন লিডার গুরুতর আহত, পরে মারা যান; সহপাইলট বেঁচে যান।
২০১৮ সালের জুলাই ও নভেম্বর – K‑8W ও F‑7BG জেট দুর্ঘটনায় ভেঙে পড়ে Jessore ও Tangail এলাকায়। পাইলট নিহত ও আহত।
২০১৭ সালের ডিসেম্বর – Cox’s Bazar-এ Yak‑130 বিমান দুইটি mid‑air সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয়; চারজন পাইলট সবাই নিরাপদে বের হন।
২০১৫ সালের মে ও জুন – Mi‑17 হেলিকপ্টার ও F‑7MB বিমান দুর্ঘটনায় পাইলট আহত ও নিহত হন।
২০০৮-২০১২ – বিভিন্ন F‑7, PT‑6, L‑39 প্রশিক্ষণ বিমানে দুর্ঘটনা, Tangail, Barisal, Ghatail উপজেলায় পাইলট নিহত।
এতদিন প্রধানত দুর্ঘটনাগুলোতে জনপদে প্রাণহানির ঘটনা ছিল না; স্কুল বা ঘনবসতি এলাকায় এমন বিধ্বস্ত হওয়া আজকের প্রথম ঘটনা, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁককে তুলে ধরে।
প্রশিক্ষণ বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী জনবহুল এলাকা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর দিয়ে বিমানের উড়ান নিষিদ্ধ। তবে সে রুটে বিমানটি কেন উড়ল? কেন নির্ধারিত আকাশসীমা অতিক্রম করা হলো?
বিমানটি কি আগেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল?
পাইলটকে কি যথাযথ পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল?
বিমানের জরুরি অবতরণের জন্য কি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল?

এখানে শুধু বিমানটির ত্রুটি নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমান চালানোর সময় যদি অবহেলা বা ত্রুটি থাকে, তবে এর দায়ভার কার? কেন জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান পাঠানো হলো?

ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় শোক, সেনাবাহিনীর বিবৃতি, এবং একটি তদন্ত কমিটির ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এটুকুই কি শেষ কথা? এক দিনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল একটি স্কুলের ভবন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজের এক বড় অংশ ঝরে গেল, অথচ এখনো জানা যায়নি—
বিমানটির ফ্লাইট প্ল্যান কী ছিল?
কোন পর্যায়ে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারায়?
বিমানে পূর্ববর্তী ত্রুটির ঘটনা ছিল কি না?
জরুরি অবতরণ পরিকল্পনা কি ছিল?
তদন্তের সময়সীমা কবে হবে এবং কি সিদ্ধান্ত আসবে? এই নীরবতা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দায় এড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই দুর্ঘটনা এক গভীর বার্তা দিয়েছে—আমরা ভয়াবহভাবে অরক্ষিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়।
এখনই প্রয়োজন—
১. সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও দায় নির্ধারণ।
২. জনবহুল আকাশসীমা থেকে প্রশিক্ষণ বিমানের পথ সরানো।
৩. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া।
৪. প্রতি স্কুলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
৫. পাইলটের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা ও রেকর্ড সংরক্ষণ।
এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া না হলে, এই জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
মাইলস্টোন কেবল একটি স্কুলের নাম নয়, এটি এখন একটি অপ্রস্তুত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক। যে দেশে শিক্ষকের দেহ পুড়ে যায় প্রশিক্ষণের আগুনে, সে দেশে শিক্ষা পুড়ছে, ভবিষ্যৎ পুড়ছে—
আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে নির্বাক দর্শকের মতো।
লেখক: শিক্ষক সাংবাদিক এবং কলামিস্ট