বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বিশ্ব চলবে: শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক হুঁশিয়ারি

বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একচ্ছত্র বিশ্বব্যবস্থা ছিল অপরিবর্তনীয় সত্যের মতো। কিন্তু বর্তমানে উদীয়মান শক্তিগুলোর উত্থান এবং বহু কেন্দ্রিক নেতৃত্বের আবির্ভাবে সেই একমুখী বাস্তবতা চ্যালেঞ্জের মুখে। এমন এক সময়েই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উচ্চারণ করেছেন এক ঐতিহাসিক হুঁশিয়ারি—“যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্ব চলবে”। এটি নিছক রাজনৈতিক উক্তি নয়, বরং একটি সুসংহত কৌশলগত বার্তা, যা আগামী বিশ্ব ব্যবস্থার কাঠামো পাল্টে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), ব্রিকস জোট, ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে চীন এক বিকল্প বিশ্ববিন্যাস গড়ে তুলছে। এই ব্যবস্থার ভিত্তি—পারস্পরিক সম্মান, যৌথ উন্নয়ন এবং একক আধিপত্য পরিহার। শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বার্তায় প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ব কেবল যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আর চলবে না।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক কালে যুক্তরাষ্ট্র তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব রক্ষা করতে গিয়ে নানা সঙ্কটে পড়েছে—আফগানিস্তান থেকে বিব্রত প্রস্থান, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-গাজা সংকট; সবগুলো ক্ষেত্রেই তার পররাষ্ট্রনীতির দ্বিমুখিতা ও বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বর দৈন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এদিকে চীন দাবি করছে—তারা “অসহিংস উন্নয়ন” ও “পরস্পর সহাবস্থানের” নীতিতে বিশ্বাসী।

নতুন আন্তর্জাতিক প্রকল্প, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (GCI):

২০২৩ সালে শি জিনপিং একটি নতুন আন্তর্জাতিক ধারণা উপস্থাপন করেন—Global Civilization Initiative (GCI)। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—বিশ্ব সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, আন্তঃসংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান-এর ভিত্তিতে একটি টেকসই বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। এই উদ্যোগ পশ্চিমা ‘একক মূল্যবোধভিত্তিক’ বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প। এর প্রতিপাদ্য—”Harmony without uniformity”—অর্থাৎ, ঐক্যের জন্য একরূপতা প্রয়োজন নেই, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই শক্তির উৎস।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে শি-এর অবস্থান:

২০২৫ সালের জুনে এক বিবৃতিতে শি জিনপিং বলেন—“ট্রেড যুদ্ধের কোনো বিজয়ী নেই।” এই মন্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণবাদী নীতির সরাসরি সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। চীন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে উন্মুক্ত বাজার, শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য এবং বহু কণ্ঠস্বরের সমন্বয় থাকবে।

একই সময়ে চীন-রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাও বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে। ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে শি ও পুতিন যৌথভাবে ঘোষণা দেন—তারা “আন্তর্জাতিক বুলিং”-এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেবেন। (সূত্র: The Washington Post, 7 May 2025)

বিশ্বের নতুন বাস্তবতা ও শি জিনপিংয়ের বার্তার তাৎপর্য:

শি জিনপিংয়ের হুঁশিয়ারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে এক নতুন বহুধাবিভক্ত বিশ্বব্যবস্থার সূচনার ঘোষণা। ভারত, তুরস্ক, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর আত্মবিশ্বাসী অবস্থানও এর অংশ। এরা কেউই আর পশ্চিমা ধাঁচে অনুগামী থাকতে চায় না, বরং নিজেদের স্বার্থে স্বাধীন নীতি গড়ে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই আর একমুখী বিশ্বে বাস করছি? উত্তর স্পষ্ট—না। এখন প্রয়োজন বহুপাক্ষিকতা, সম্মিলিত নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক সম্মাননির্ভর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।

সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, তবে আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে এসেছে। শি জিনপিংয়ের বার্তা তাই সময়োচিত এবং তাৎপর্যপূর্ণ—বিশ্ব এখন একক নেতৃত্বে নয়, বরং বহুকণ্ঠের সম্মিলনে পরিচালিত হবে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় কেবল শক্তির নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও পুনর্বিন্যাস ঘটছে।

লেখক: শিক্ষক সাংবাদিক এবং কলামিস্ট