ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে!

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারত। দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে নানা ঘটনাপ্রবাহে সেই নীতির বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৩ সালের “আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন” বিষয়টিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতে সংখ্যালঘু বিশেষত মুসলমানদের ওপর সহিংসতা ও নিপীড়ন বাড়ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের নীরবতা বা প্রত্যক্ষ মদদের মাধ্যমে ঘটছে। গরু রক্ষা, লাভ জিহাদ, ধর্মান্তরণ বিরোধী আইন ইত্যাদি অজুহাতে মুসলমানদের টার্গেট করে নানা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা শুধু আশঙ্কাজনকই নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতের ইঙ্গিত বহন করে।

২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। দাঙ্গায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের সিংহভাগই মুসলমান। বিভিন্ন অনুসন্ধান ও মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতা ঠেকানোর পরিবর্তে মৌন দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি কিছু ঘটনায় প্রভাবশালীদের চাপ বা রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে মামলা হলেও তা তদন্তের মুখ দেখেনি।

ভারতের শাসক দল বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর আদর্শিক সম্পর্ক নতুন নয়। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে ঘৃণাভাষণ দিচ্ছে, ধর্মীয় উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। মুসলিম ব্যবসায়ী, শিক্ষক, এমনকি শিল্পীরাও আজ সামাজিক মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। কোথাও আবার মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্যালয়ে অপমানিত হতে হচ্ছে।

ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার এই প্রবণতা শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতের এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। যদিও ভারত এসব প্রতিবেদনকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে, তবু বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।

ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমান আজ নিজেদের নিরাপত্তাহীন ও উপেক্ষিত মনে করছেন। রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেললে কোনো নাগরিকই সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের স্রোতে যুক্ত হতে পারেন না। দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য সমাজে গভীর বিভাজন তৈরি করবে, যা সহিংসতা, বিদ্বেষ ও চরমপন্থার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

ভারত যদি সত্যিই একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে তাকে কেবল সংখ্যাগুরু আবেগে ভর না করে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতেই হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা যেন সংবিধানের পাতায় না থেকে বাস্তব প্রশাসনিক ও সামাজিক নীতিতে প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।


ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা কেবল তাদের একার বিষয় নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক শান্তি ও সহাবস্থানের প্রশ্নেও তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভারতের উচিত হবে ঘর সামলানো—অন্যকে দোষ না দিয়ে আত্মসমালোচনায় যাওয়া।

লেখকঃ শিক্ষক,সাংবাদিক এবং কলামিস্ট