মাদুর শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তালার গৃহবধূ মঞ্জুরি রানী সরকার

সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বিলুপ্ত প্রায় মেলের মাদুর শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তালার গৃহবধূ মঞ্জুরি রানী সরকার ও তার পরিবার। বিলুপ্ত প্রায় মেলের মাদুর শিল্পটি টিকিয়ে রেখেছেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে।এটাই তার পেশা,এটাই তাদের শেষ ভরসা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন,মূলত,কাঁচামালের অভাব,প্লাস্টিক মাদুরের চাহিদা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে এই শিল্পের সাথে জড়িতরা দাবি করেন।তবে প্রত্যন্ত গ্রামে মঞ্জুরি রানী সরকারের মতো কিছু কিছু অঞ্চলে এখনো এই শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখছে।অনেকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তাদের আদিম পেশা।
এক সময় সাতক্ষীরার তালা,আশাশুনি ও খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা অঞ্চলে মাদুর তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল।বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে এই মেলের মাদুর শিল্পটি।তালা উপজেলার বাতুয়াডাঙ্গা,মাদরা,কলাগাছি গ্রামের উঠান গুলোতে এখনো চলছে মাদুর বুনার উৎসব। সেসব দৃশ্য এখন কেবল গল্পকথা। অনেকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তাদের এই আদিম পেশাটি।
সরেজমিনে তালার বাতুয়াডাঙ্গা গ্রামের যেয়ে দেখা যায় গৃহবধূ মঞ্জুরি রানী সরকার মাদুর তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।স্বামী পিযুষ সরকারকে নিয়ে মাদুর বুনেই চলছে তাদের সংসার। তাদের ভিটা বাড়ি ছাড়া নেই কোন চাষের জমিজমা,মাদুর শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে আজও পাইনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা।
মাদুর শিল্পী মঞ্জুরি রানী সরকার বলেন,”এই মাদুরই আমাদের জীবন-জীবিকা।যেদিন মাদুর বুনতে না পারি, সেদিন মনে হয় পেটের ক্ষুধাটা বেশি জ্বলে।সাধারণত একটা মেলের মাদুর বানাতে একদিন লেগে যায়।ছোট-বড় মাদুর বিক্রি করি ৩শ’- ৪শ’ টাকায়। খরচ বাদে বর্তমানে তেমন কিছুই থাকে না।তবুও বুনেই চলেছি মাদুর।আশার বাণী হলো বর্তমানে মাদুর শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছে মুক্তি ফাউন্ডেশন নামের তালার একটি বেসরকারি সংস্থা।বিনা শর্তে তারা কিছু মূলধন দিচ্ছে।যার মাধ্যমে গরিব কারিগররা আবারও মাদুর বুনতে শুরু করতে পারে।তবে চাহিদা ও বাজার না থাকায় উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে হাটে-ঘাটে মাদুরের কদর ছিল।
তিনি বলেন,সাতক্ষীরার তালা, আশাশুনি,খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা অঞ্চলে এক সময় “মেলে” ঘাস চাষ করতো চাষীরা।যা দিয়ে মাদুর তৈরি করা হতো।কিন্তু বর্তমানে মৎস্য ঘেরের জন্য জমি ব্যবহারের কারণে মেলে ঘাস চাষ কমে গেছে।সেই সাথে বাজারে প্লাস্টিক মাদুরের সহজলভ্যতা এবং দাম কম হওয়ায় মেলে মাদুরের চাহিদা কমেছে।একসময় এই শিল্পে বহু পরিবার জড়িত থাকলেও,বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে।অনেক কারিগর এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নতুন করে মেলে ঘাস চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার অভাবে এই শিল্প আরও সংকটের দিকে যাচ্ছে।এখন বাজারে রেক্সিন,প্লাস্টিকের ম্যাট এসে সেই স্থান দখল করেছে।ফলে ঐতিহ্যবাহী এই মেলের মাদুর শিল্পটি হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
পিযুষ সরকার বলেন,”দলুয়া, খলিষখালী,পাটকেলঘাটা,তালার হাটে মাদুর বিক্রি করতে নিয়ে যায়।কোন দিন বিক্রি হয়, আবার কোন দিন পুরোটাই ফেরত নিয়ে আসতে হয়। একসময় তালা উপজেলায় ২শ’-৩শ’ পরিবার মাদুর তৈরিতে নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০-৩০টিতে। মেলে চাষের পরিমাণ গত এক দশকে প্রায় ৯০% কমে গেছে। প্রতিটি পরিবারে আয় গড়ে ২শ’-৩শ’ টাকা দৈনিক, যা ন্যূনতম জীবনধারণের জন্যও যথেষ্ট নয় বলে তারা দাবি করেন।
খেশরা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ কামরুল ইসলাম লাল্টু জানান,”বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার কারণে মেলে চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। একে টিকিয়ে রাখতে হলে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহি এই মেলে মাদুর বুনা শিল্পটি।”

মুক্তি ফাউন্ডেশন পরিচালক গোবিন্দ ঘোষ বলেন, মাদুর শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছে মুক্তি ফাউন্ডেশন।সংস্থার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে মাদুর তৈরির জন্য উপজেলার ৫০ পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রো টেকনোলজি বিভাগের একটি রিসার্স টিমের সহযোগিতায় মেলে চাষের জন্য ৫০টি প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছে।মেলে চাষের জন্যে প্রতিটি প্লটের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার তালার স্থানীয় কলেজ শিক্ষক কৃষ্ণ কুমার মন্ডল মনে করেন, মাদুর তৈরির উপকরণ (মেলে) আমদানি না করে স্থানীয়ভাবে চাষে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।মাদুর শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে সহজশর্তে ঋণ, প্রণোদনা, মহিলা হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ ও বিপণন প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন ও আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারলে হারিয়ে যাওয়া এ ঐতিহ্য আবরো সুদিন বয়ে আনতে পারে বলে তিনি মনে করেন। প্রয়োজন শুধু সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, সহায়তা, আগ্রহ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে পারে তার হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলা কৃষি অফিসার হাজিরা খাতুন বলেন, মাদুর তৈরির মূল কাঁচামাল ‘মেলে’ এক সময় এই এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ হতো। কৃষকেরা বৃষ্টির মৌসুমে মাঠে নামত মেলে লাগাতে, আর শুষ্ক মৌসুমে তা শুকিয়ে ঘরে আসত। তারপর শুরু হতো মেলের মাদুর বুনার কাজ।মেলে চাষে সময় ও খরচ কম লাগে। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টি ও নদীভাঙন অনেক চাষিকে নিরুৎসাহিত করেছে বিলুপ্ত প্রায় এই মেলে চাষে।