শুধু মারামারিতেই সীমাবদ্ধ নেই চাঁদাবাজি করছে কিশোর গ্যাং

সারাদেশের সাথে পাল্লা দিয়ে বগুড়ার শেরপুরে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোরেরা সন্ধ্যার পর দেশীয় অস্ত্রসহ সংঘবদ্ধ হয়ে নিয়মিত রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা, ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত, মাদক সেবন, দোকানে-দোকানে ঘুরে চাঁদা দাবি, বিকট শব্দে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানোসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন এবং এলাকার বাসিন্দারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

ঈদের তৃতীয় দিন সোমবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার শেরপুর শহীদিয়া আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় দেশীয় অস্ত্রসহ উভয় পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পথচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক এবং বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে মিরাজ (১৮) নামের এক ছুরিকাহত কিশোরকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েও দুই গ্রুপের সদস্যরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঈদের পর দিন রোববার উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের জোড়গাছা ব্রিজের উপর মোটরসাইকেল রেখে আড্ডা দিতে দেখা যায় কয়েকজন বখাটে ছেলেকে। অতঃপর একজন পথচারী রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ানোর কথা বলতেই পথচারীর উপর আক্রমণ করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পরবর্তীতে এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে পুলিশের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। গত এক মাসে তুচ্ছ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দ্বারা আহত হয়েছে ২০-২৫ জন। যার মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যও রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোনো ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার সাহস পায়নি ভুক্তভোগীরা।

শুধু মারামারিতেই সীমাবদ্ধ নেই এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তারা উপজেলার কলেজ রোড, বাসস্ট্যান্ড ফলপট্টি, ধুনটমোড়, শেরুয়া বটতলা বাজার, মির্জাপুর বাজার, জামাইল হাট এলাকার বিভিন্ন দোকান থেকে চাঁদাবাজি করে আসছে।

উপজেলার ধুনটমোড় এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে তার দোকানে এসে চাঁদা দাবির কথা জানিয়েছেন। একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গ্যাংয়ের এক সদস্য এসে টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিতে চাওয়ায় হাতে থাকা হেলমেট দিয়ে দোকানির মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করে কিশোর গ্যাংয়ের ঐ সদস্য। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল কিশোর গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা। আশেপাশের অন্যান্য দোকানিরাও দেশ রূপান্তরকে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য কথা কাটাকাটি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ হলেই কিশোর গ্যাং সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা করে। হাতে দা, ছুরি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে আসে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষকে আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। এ অবস্থায় এলাকাবাসী শেরপুর থানা পুলিশের প্রতি টহল জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। এলাকাবাসী মনে করেন, পুলিশের নিয়মিত টহল ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

উপজেলার ধুনটরোড এলাকার বাসিন্দা হারুন বলেন, ‘এলাকায় ইদানীং চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মোবাইল চুরি হচ্ছে বেশি। দিনের বেলায়ও বাসা-বাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। আমাদের প্রতি মুহূর্তে চোর ও কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে থাকতে হয়। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দ্রুত কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, তারা রাতে স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারছে না। কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম্যে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সামান্য বিবাদেই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। দ্রুত যদি পুলিশ টহল না বাড়ায়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

শেরপুর সরকারি ডি.জে মডেল হাইস্কুল এলাকার বাসিন্দা বলেন, সন্ধ্যার পর ডি.জে হাইস্কুল থেকে দক্ষিণ দিকে ডি.জে হাইস্কুল মাঠ পর্যন্ত, হাসপাতাল রোডের কবরস্থান থেকে গাড়িদহ রোড পর্যন্ত, কলেজ রোড থেকে গোসাইবাড়ি বটতলা পর্যন্ত, ধুনটরোড তালতলা থেকে দহপাড়া এলাকায় কিশোর গ্যাং দল বেঁধে ঘোরাফেরা করে। এজন্য সন্ধ্যার পর ওদিক দিয়ে চলাফেরার সময় এলাকাবাসী খুব আতঙ্কে থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেরপুর থানায় আমি নতুন এসেছি। তবে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বরাবরই কঠোর অবস্থানে থাকে থানা পুলিশ। উল্লিখিত স্পটগুলোতে খুব শিগগিরই টহল জোরদার করা হবে। সেইসাথে ভুক্তভোগীদের বলব এমন কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বা অপরাধ দেখামাত্র আমাদেরকে জানাবেন। আপনাদের নাম পরিচয় গোপন রেখেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ যেসব কিশোর অপরাধে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’