সাংবাদিকতায় গ্রুপিং – সংবাদ মাধ্যমের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিরোধের লড়াই!

সাংবাদিকতা মূলত স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার অঙ্গীকার নিয়ে পথচলা এক মহান পেশা। তবে বাস্তবতায় সাংবাদিকতায় আজ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গ্রুপিং’ বা গোষ্ঠীবদ্ধতা। সাংবাদিকরা যখন স্বার্থের মঞ্চে ভাগাভাগি হয়ে পড়েন, তখন সত্যের সন্ধান ও নিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ বাস্তবতা শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, সারা সমাজের জন্যও এক অশনি সংকেত।

গ্রুপিং বলতে বোঝায় সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা অর্থনৈতিক ফায়দা আদায়ের উদ্দেশ্যে গোষ্ঠীভিত্তিক ধারা। এতে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশনা ও সাংবাদিকতার সার্বিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে পক্ষপাতমূলক, জনগণ বঞ্চিত হয় সত্য সংবাদ থেকে, আর সংবাদমাধ্যম হারায় তার আস্থার ভিত্তি।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় গ্রুপিং নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব বা গণমাধ্যমকেন্দ্রিক সংগঠনগুলো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছায়ায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলেই একদিকে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন, অন্যদিকে সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এ ধরনের গ্রুপিং-এর ভয়াবহ ফলাফল আমরা বারবার দেখেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০১ সালে সাংবাদিক তিপু সুলতানকে গোষ্ঠী স্বার্থে নির্মমভাবে পিটিয়ে হাত ভেঙে ফেলার ঘটনা, ২০২৪-২৫ সালে প্রেস ক্লাব ও টিভি চ্যানেল অফিসে হামলা, ২০২৫ সালের শরীয়তপুরে সাংবাদিক সংঘর্ষ, এবং ২০২৩ সালে ফেনীতে ত্রিমুখী সংঘর্ষের সময় সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ। এসব ঘটনায় সাংবাদিকরা আহত হয়েছেন, তাদের ক্যামেরা ও সরঞ্জাম ভাঙা হয়েছে, এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গ্রুপিং-এর ক্ষতি এখানেই শেষ নয়। জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারও বিপন্ন হয়। যখন সাংবাদিকতা দলীয় বলয়ের মধ্যে আটকা পড়ে, তখন সংবাদ আর ‘নির্ভরযোগ্য তথ্য’ হয়ে থাকে না—তা হয়ে যায় ‘গোষ্ঠীর স্বার্থের হাতিয়ার’।

তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাবসহ গণমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সাংবাদিকতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বস্তুনিষ্ঠতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা জোরদার করতে হবে। আর পাঠক সমাজকেও সচেতন হতে হবে—কোনো পক্ষের ‘ভাড়াটে সংবাদ’ নয়, সত্যের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতায় গ্রুপিং মানে পেশার অন্তঃসারশূন্যতা—যা শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা হারানোর নামান্তর। সত্য ও নিরপেক্ষতার চর্চা থাকলেই একে প্রতিহত করা সম্ভব। আর এই চেষ্টাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সমাজের স্বার্থরক্ষায় সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: শিক্ষক সাংবাদিক এবং কলামিস্ট।