অপসাংবাদিকতার জোয়ারে ডুবে যাওয়া কলম
আজকের সংবাদজগত এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সত্যের বিশাল গাছটির চারপাশে হঠাৎ করেই জন্মেছে লতাপাতার মতো কিছু নতুন মুখ, যারা নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিতে এতটাই ব্যস্ত যে সত্যের গাছটা চোখেই পড়ে না। হাতে একটা ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন আর গলায় ঝুলানো আইডি কার্ড, এসবই এখন যেন সাংবাদিকতার ‘শংসাপত্র’। অথচ এই পেশা কোনো প্রদর্শনীর পোশাক নয়; এটি এক সাধনার পথ, যেখানে প্রতিটি শব্দ পাথরের মতো খোদাই করতে হয়, প্রতিটি বাক্য গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতার আগুনে।অসাংবাদিকদের এই দাপটকে মনে হয় বর্ষার পরে হঠাৎ জমে ওঠা মৌসুমি খাল। তারা আসে ঝড়ের মতো, দু-একটা ছবি তোলে, কোলাহল করে, নিজেদের বড় পরিচয় দেয়; কিন্তু রোদ উঠলেই দেখা যায়, তাদের স্রোত নেই, গভীরতা নেই, আর মাটির টানও নেই। সাময়িক জলস্রোতের মতো তারা কিছুদিন আলোড়ন তোলে, তারপর ধীরে ধীরে মাটি ফেটে শুকিয়ে যায়। কারণ তারা যে বীজ নিয়ে আসে, তা হলো মুখস্থ নাম, ধার করা ভাষা আর তোষামোদের ঝুড়ি নিয়ে, যার কোনোটিই সাংবাদিকতার জমিতে ফসল হয়ে জন্মাতে পারে না। মাঝে মাঝে মানহীন পত্রিকা বা ফেসবুকে তাদের দু-একটা প্রতিবেদন চোখে পড়লেও, তার অধিকাংশই অন্যের প্রতিবেদনের সরাসরি বা আংশিক কপি করা।প্রকৃত সাংবাদিকরা জানেন সংবাদ লেখা মানে কেবল শব্দ সাজানো নয়, সত্যের ছায়া ধরে তার রূপ উন্মোচন করা। সেখানে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আছে, ভাষার সৌন্দর্য আছে, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু অসাংবাদিকদের চোখে সাংবাদিকতা শুধু একটি ‘পদবী’। একটি আইডি কার্ড, যা হয়তো কোনো নামমাত্র পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে পাওয়া যায়, সেই কার্ড তারা গলায় ঝোলায় গর্বের সঙ্গে। এই কার্ডটিই যেন হয়ে ওঠে ক্ষমতার চাবিকাঠি। তারা ভেবে বসে, এই কার্ডই তাদের প্রতিষ্ঠা দেবে। অথচ এই প্রতিষ্ঠা হলো বালির দুর্গ, একটু ঢেউ এলেই ভেঙে পড়ে। তাদের মেধার পরিসরও ছোট। তারা জানে না শব্দচয়ন কীভাবে পাঠকের বোধে আলো জ্বালায়; জানে না একটি প্রতিবেদনে তথ্যের কোন শাখা কোন কা-ে যুক্ত হয়; জানে না কোন প্রশ্ন করলে সত্য বেরিয়ে আসে। তাদের লেখায় নেই বিশ্লেষণের গভীরতা, নেই বাক্যের যুক্তিতন্ত্র, নেই অনুসন্ধানের মাটি-ঘেঁষা গন্ধ। তারা শব্দের বাগানে এসে ফুল চিনতে না পেরে কেবল পাতা ছিঁড়ে দেখায়।এইসব মেধাহীন অসাংবাদিকরা একসময় স্থানীয় রাজনীতির ছায়ায় গা বাঁচায়। নেতাদের তোষামোদ করে, তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, তাদের কথাকে মাথা নেড়ে সমর্থন করে। এরপর কিছুদিন পর তাদের পরিচয়ে যুক্ত হয় ‘সাংবাদিক নেতা’। এই পদবী নির্মাণ করতে তাদের প্রয়োজন হয়নি কোনো ভাষা পারদর্শিতা, প্রয়োজন হয়নি অনুসন্ধানী দৃষ্টি বা সৎ সাহস; প্রয়োজন হয়নি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার অভিভাবকত্ব। বরং তারা এই পদটি পেয়েছে তেলমর্দণ ভক্তির মাধ্যমে, যা সাংবাদিকতার পবিত্র পথকে কদর্য করে। এর বিপরীতে প্রকৃত সাংবাদিকরা হন নীরব, সংযত, কঠোর পরিশ্রমী। তারা বৃষ্টির রাতেও বের হন তথ্য খুঁজতে, তারা নিঃসঙ্গ দুপুরেও সাক্ষাৎকার নেন, তারা ভোরের আলোয় লেখেন চলমান ঘটনার বিশ্লেষণ। তাদের পরিচয় মানুষের চোখে বড় হয় না চিৎকারে, বরং সঠিক শব্দের শক্তিতে। শোরগোল নয়, নির্ভুলতা তাদের সৌন্দর্য। কিন্তু এই গভীর শ্রম এখন ভিড়ে আড়াল হয়ে যায়। কারণ আজকাল মানুষ দ্রুত উত্তেজনার দিকে ঝোঁকে, যেখানে একটি ‘লাইভ ভিডিও’ বা ‘হঠাৎ ব্রেকিং নিউজ’ মুহূর্তেই জনপ্রিয়তা এনে দেয়। অথচ এই জনপ্রিয়তা সাময়িক; এটি তার নিজের ছায়াকেও দীর্ঘ করতে পারে না।সাময়িক সাংবাদিকরা যত উঁচুতেই উঠুক, তারা গভীরতা লাভ করতে পারে না। কারণ গভীরতা আসে অভিজ্ঞতা থেকে, আসে পাঠ্যাশ্রয়ী মনন থেকে, আসে ধারাবাহিক শ্রম থেকে। তাদের কাজে নেই পরিপক্বতা; তাদের ধার মত্ত, কিন্তু অগভীর। তারা যতই শব্দ সাজাক, তাদের বাক্য নদীর মতো চলে না, বরং টাপুর-টুপুর বৃষ্টির মতো পড়েই শেষ হয়ে যায়। তাই তারা যতই কোলাহল করুক, প্রকৃত সাংবাদিকতার দিগন্তে তাদের স্থান নেই।প্রকৃত সাংবাদিকরা, তারা খুব বেশি কথা বলেন না। তারা জানেন সত্য ধীর হেঁটে চলে। নদীর মতো ধীর, কিন্তু অবারিত। শুষ্ক মৌসুমেও নদী যেমন কোথাও না কোথাও আপন স্রোত ধরে রাখে, তেমনি প্রকৃত সাংবাদিকতাও নিঃশব্দে নিজের গভীরতা নির্মাণ করেন। তারা কাজ করেন বছরের পর বছর মানুষের চোখে অদেখা থেকে, কিন্তু ইতিহাসের চোখে অমর হয়ে। তারা এক সময় বুঝে ফেলেন অসাংবাদিকদের চমক একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু বিশ্বাসের শব্দ কখনো নিঃশেষ হয় না।সমাজ এখন এক বিভ্রান্তির মোড় পেরোচ্ছে। অনেকেই ভাবছে ফেসবুকে ছবি তুলে পোস্ট করাই সংবাদ। লাইভ ভিডিও করাই সংবাদ। কিন্তু সংবাদ মানে কেবল ঘটনার প্রদর্শনী নয়; সংবাদ মানে সত্যের বিশ্লেষণ, মানুষের দুঃখের ভাষা, সমাজের বাস্তবতার ব্যাখ্যা। যারা এই বোধটি বুঝতে পারে না, তারা সাময়িক আনন্দে ভেসে থাকে। তাদের কলম অচিরেই থেমে যায়, তাদের আলো মিলিয়ে যায় সন্ধ্যার আগেই। কারণ মেধাহীনতার আলো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অসাংবাদিকদের এই দাপট তাই স্থায়ী হবে না। সময়ই তাদের ছেঁকে ফেলবে। সত্যবাদী নদী যখন প্রবাহিত হবে, তখন আর তারা ভেসে থাকতে পারবে না। সাংবাদিকতার আসল যাত্রা কখনোই তাদের জন্য ছিল না। সূর্যের মতো জ্বলতে চাওয়া মানুষ কখনোই টিকে না যদি ভেতরে আলো না থাকে। তাই সাংবাদিকতার পথ সেই মানুষদেরই জন্য, যারা সত্যের প্রতি অটল, যারা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ, যারা শব্দের প্রতি প্রেমিক। অসাংবাদিকরা সাময়িক; তারা সময়ের ধূলোয় মিশে যাবে। কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিকরা, তারা সময়কেও অতিক্রম করবেন নিজেদের শ্রম, সততা ও আলো নিয়ে। ইতিহাস সবসময়ই সেই সত্যের সাধকদের হাতেই কলম তুলে দেয়।