দৃষ্টি প্রতিদিন
প্রকাশ : সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

শাজাহানপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে হরিলুট: মৃত ও প্রবাসীদের নামে তোলা হচ্ছে চাল

শাজাহানপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে হরিলুট: মৃত ও প্রবাসীদের নামে তোলা হচ্ছে চাল

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় সরকারের অতিদরিদ্রদের জন্য পরিচালিত ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’তে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু চক্র চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছে। এছাড়া ডিলারের গুদামে চাল সংরক্ষণেও চরম অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার খরনা ইউনিয়নের বনভেটি গ্রামে হবিবর রহমান আকন্দের স্ত্রী রোকসানা বিবি (কার্ড নম্বর ১৯২) মারা গেছেন প্রায় তিন বছর আগে। অথচ দাপ্তরিক নথিতে তার নাম এখনো সচল এবং নিয়মিত তার নামে চাল তোলা হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা গেছে চকভ্যালি গ্রামে। সেখানকার ৫৭৭ নম্বর কার্ডধারী ইউসুফ আলী সরকার মারা গেছেন ৩ বছর আগে। তার স্ত্রীর অভিযোগ, "স্বামী মারা যাওয়ার পর কিছুদিন চাল পেলেও গত ১৭ মাস ধরে আমাদের কোনো চাল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ কার্ডটি এখনো আমার কাছেই সংরক্ষিত আছে।"

কেবল এই দুজনই নন, তালিকায় এমন অসংখ্য নাম রয়েছে যারা হয় কয়েক বছর আগে মারা গেছেন অথবা জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্র ও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এসব ভুয়া নামে চাল তুলে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত দুস্থ ও কার্ড পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিযুক্ত ডিলার মিজানুর রহমান শাকিলের ‘খরনা হাট’ সংলগ্ন গুদামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সরকারি চাল সংরক্ষণে চরম গাফিলতি। সরকারি বস্তায় ‘হুক ব্যবহার নিষেধ’ মর্মে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করা হয়েছে। অনেক বস্তার মুখ খোলা এবং চাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে বস্তা খুলে রাখা মূলত ওজনে কারচুপি কিংবা চাল চুরির একটি কৌশল।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিলার মিজানুর রহমান শাকিল বলেন, "গাড়ি থেকে চাল নামানোর সময় হুক ব্যবহারের কারণে কিছু বস্তা ছিঁড়ে যেতে পারে। মৃত বা প্রবাসীদের নামে চাল উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নিয়ম মেনেই বিতরণ করছি।"

তবে হুক ব্যবহারের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কেন অমান্য করা হলো—এ বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাইফুর রহমান জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি বলেন, "এই কর্মসূচিটি মূলত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তদারকি করেন। তবে কোনো ধরনের অনিয়মের তথ্য প্রমাণ মিললে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল মজিদ-এর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সরকারের জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পে এমন হরিলুটে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, অতিদ্রুত ডিজিটাল ডাটাবেজ হালনাগাদ করে মৃত ও প্রবাসীদের নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ডিলার ও কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৃষ্টি প্রতিদিন

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


শাজাহানপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে হরিলুট: মৃত ও প্রবাসীদের নামে তোলা হচ্ছে চাল

প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় সরকারের অতিদরিদ্রদের জন্য পরিচালিত ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’তে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু চক্র চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছে। এছাড়া ডিলারের গুদামে চাল সংরক্ষণেও চরম অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার খরনা ইউনিয়নের বনভেটি গ্রামে হবিবর রহমান আকন্দের স্ত্রী রোকসানা বিবি (কার্ড নম্বর ১৯২) মারা গেছেন প্রায় তিন বছর আগে। অথচ দাপ্তরিক নথিতে তার নাম এখনো সচল এবং নিয়মিত তার নামে চাল তোলা হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা গেছে চকভ্যালি গ্রামে। সেখানকার ৫৭৭ নম্বর কার্ডধারী ইউসুফ আলী সরকার মারা গেছেন ৩ বছর আগে। তার স্ত্রীর অভিযোগ, "স্বামী মারা যাওয়ার পর কিছুদিন চাল পেলেও গত ১৭ মাস ধরে আমাদের কোনো চাল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ কার্ডটি এখনো আমার কাছেই সংরক্ষিত আছে।"

কেবল এই দুজনই নন, তালিকায় এমন অসংখ্য নাম রয়েছে যারা হয় কয়েক বছর আগে মারা গেছেন অথবা জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্র ও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এসব ভুয়া নামে চাল তুলে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত দুস্থ ও কার্ড পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিযুক্ত ডিলার মিজানুর রহমান শাকিলের ‘খরনা হাট’ সংলগ্ন গুদামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সরকারি চাল সংরক্ষণে চরম গাফিলতি। সরকারি বস্তায় ‘হুক ব্যবহার নিষেধ’ মর্মে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করা হয়েছে। অনেক বস্তার মুখ খোলা এবং চাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে বস্তা খুলে রাখা মূলত ওজনে কারচুপি কিংবা চাল চুরির একটি কৌশল।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিলার মিজানুর রহমান শাকিল বলেন, "গাড়ি থেকে চাল নামানোর সময় হুক ব্যবহারের কারণে কিছু বস্তা ছিঁড়ে যেতে পারে। মৃত বা প্রবাসীদের নামে চাল উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নিয়ম মেনেই বিতরণ করছি।"

তবে হুক ব্যবহারের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কেন অমান্য করা হলো—এ বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাইফুর রহমান জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি বলেন, "এই কর্মসূচিটি মূলত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তদারকি করেন। তবে কোনো ধরনের অনিয়মের তথ্য প্রমাণ মিললে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল মজিদ-এর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সরকারের জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পে এমন হরিলুটে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, অতিদ্রুত ডিজিটাল ডাটাবেজ হালনাগাদ করে মৃত ও প্রবাসীদের নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ডিলার ও কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।


দৃষ্টি প্রতিদিন

প্রকাশক ও সম্পাদক এসএম আমিনুল মোমিন, আইন বিষয়ক সম্পাদক, অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান


কপিরাইট © ২০২৬ দৃষ্টি প্রতিদিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত