এক হাতে কলম আর অন্য হাতে মানবতার অঙ্গীকার—এই দুই শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই হাঁটতে চাই সেই সব মানুষের ভিড়ে, যাঁদের গল্প আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকলেও খুব কমই আলোয় আসে। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম লেখা থাকে না, সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনামেও তাঁরা জায়গা পায় না; অথচ তাঁরাই এই সমাজের নীরব ভিত্তি, অদৃশ্য শক্তি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সংবাদ মানে কেবল তথ্যের পরিসংখ্যান নয়। সংবাদ মানে মানুষের গল্পের কান্না, হাসি, সংগ্রাম, বেদনা আর স্বপ্নের এক জীবন্ত ঠিকানা।
আমরা যখন উন্নয়নের গল্প বলি, তখন চোখে ভাসে উঁচু দালান, আলোকিত শহর, আধুনিক জীবনযাত্রা। কিন্তু সেই আলোয় ঢাকা পড়ে যায় এক বিশাল অন্ধকার - একটি ভিন্ন বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিদিন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে, প্রতিটি দিন যেখানে এক একটি যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের নেই কোনো করতালি, নেই কোনো সংবাদ সম্মেলন - আছে শুধু নীরব সহ্যশক্তি আর অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
এই দেশে আজও এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে একজন মানুষের এক দিনের উপার্জন বন্ধ মানেই পুরো পরিবারের না খেয়ে থাকা। এমন অসংখ্য রাত আছে, যেখানে ক্ষুধা আর ক্লান্তির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে মানুষ। বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘরে, রাস্তার ধারে, কোনো অচেনা কোণে - অসংখ্য স্বপ্ন প্রতিদিন জন্ম নেয়, আবার প্রতিদিনই নিঃশব্দে ভেঙে যায়।
তবুও এই মানুষগুলো হারে না। পেটে পাথর বেঁধে, চোখে অদৃশ্য জল নিয়ে, বুকভরা কষ্ট লুকিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকে।
একটি রুটি ভাগ করে খেয়েও যাঁরা পুরো দিন পার করে দেয়, তাঁদের মুখে আপনি অভিযোগ শুনবেন না; বরং দেখবেন এক অদ্ভুত শান্তি, এক অদম্য আত্মসম্মান। চাল নেই, চুলো নেই - তবুও মাথা উঁচু করে বাঁচার যে শক্তি, তা আমাদের অনেকেরই নেই। এরা হাত পাততে জানে না, এরা হাল ছাড়তে জানে না।
অদ্ভুত এক গল্প - যাদের কিছুই নেই, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি দেয়।
নিজের কষ্ট ভুলে অন্যের বিপদে ছুটে আসে, নিজের ক্ষুধা ভুলে অন্যকে খেতে দেয়, নিজের নিরাপত্তা ভুলে অন্যকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে যখনই কোনো দুর্যোগ নেমে আসে - হোক তা বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অগ্নিকাণ্ড—সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয় এই প্রান্তিক মানুষগুলোই। রাতারাতি ভেসে যায় তাদের ঘরবাড়ি, হারিয়ে যায় জীবিকার শেষ সম্বলটুকু। কেউ আশ্রয় নেয় বাঁধের ওপর, কেউ স্কুলঘরের এক কোণে, কেউবা খোলা আকাশের নিচে। পরিবার নিয়ে তারা অনিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের দিকে।
দুর্যোগ শেষে সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলে যায়। তবে তাদের জীবন আর আগের জায়গায় ফিরে যায় না। নতুন করে শুরু করার মতো পুঁজি তাদের থাকে না, তবুও তাঁরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে—অদম্য সাহস আর বেঁচে থাকার জেদ নিয়েই। এসব বিপর্যস্ত মানুষের কান্না, তাঁদের হারানোর বেদনা আর নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম—এসবই আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা, যা বারবার আমাদের চাকচিক্যময় জীবনের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
আমরা অনেক সময় এই মানুষগুলোকে অবহেলা করি, তুচ্ছ ভাবি, তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাই। কিন্তু সত্যটা হলো—আমাদের আরাম, আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য, আমাদের এই তথাকথিত ‘কমফোর্ট জোন’ গড়ে উঠেছে তাঁদের অগণিত ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে। তাঁরা হাসিমুখে নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে।
এ সকল মানুষের গল্প যখন আমার কলমে ধরা পড়ে, তখন হৃদয়ে এক অদ্ভুত ঝড় ওঠে। মনে পড়ে বিদ্রোহী কবি প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম এর সেই জাগরণী আহ্বান—
“আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?,
তোমার ছেলে উঠলে মাগো, রাত পোহাবে তবে।”
এই পঙক্তি যেন শুধু কবিতা নয়—এটি এক ডাক, এক শপথ, এক দায়িত্ব।
তখন মনে হয়, শুধু লিখে গেলেই হবে না।
আমি শুধু লিখতে চাই না—আমি পাশে দাঁড়াতে চাই।
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি চাই, আমার কলম কেবল গল্প বলবে না - মানুষের কষ্টের কাছে পৌঁছাবে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি হয়ে উঠবে। আমি চাই, ক্যামেরার লেন্স শুধু ছবি তুলবে না - মানুষের যন্ত্রণা ধারণ করে সমাজকে নাড়িয়ে দেবে।
আমি ছুঁতে চাই সেই বাস্তবতা—
যেখানে এক মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ক্ষুধা ভুলে যায়,
যেখানে এক শ্রমিক ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবারও পরদিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়,
যেখানে এক শিশু স্বপ্ন দেখতে শেখার আগেই বাস্তবতার কঠিন পাঠ শিখে নেয়।
আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই—
তাঁদের কষ্টের সময়,
তাঁদের লড়াইয়ের মুহূর্তে,
তাঁদের ক্ষুদ্র সুখের দিনগুলোতে।
আমি বিশ্বাস করি, একজন সাংবাদিক কেবল ঘটনার বর্ণনাকারী নন - তিনি সমাজের দর্পণ, বিবেক, মানুষের কণ্ঠস্বর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক প্রতিবাদ। তাই আমার দায়িত্ব শুধু রিপোর্ট লেখা নয়; আমার দায়িত্ব অনুভব করা, উপলব্ধি করা এবং প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করা।
হয়তো আমি একা পৃথিবী বদলে দিতে পারব না।
কিন্তু আমি একজন মানুষের কষ্ট তুলে ধরতে পারি,
একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি,
একটি নীরব গল্পকে কণ্ঠ দিতে পারি।
আর কখনও কখনও একটি সত্য গল্পই যথেষ্ট—পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
আমরা তো সেই জাতি! যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে স্বাধীনতা। সেই ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে - ঐক্য আর সহমর্মিতার শক্তির গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।
তাহলে কেনো আমরা পারব না?
কেনো আমরা পারব না এই বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিতে?
কেনো আমরা পারব না একজন মানুষের চোখের জল মুছে দিতে?
হয়তো আমাদের সবার কাছে বিপুল অর্থ-সম্পদ নেই, কিন্তু আমাদের আছে মানবতা, আছে মমত্ববোধ, আছে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। আমাদের আছে একটি সহানুভূতিশীল, সাহসী এবং মানবিক হৃদয়। এই হৃদয়ই পারবে একদিন সবকিছু বদলে দিতে।
আমি লিখব—কারণ সত্য বলা প্রয়োজন।
আমি দাঁড়াব—কারণ মানুষের পাশে থাকা প্রয়োজন।
আমি লড়ব—কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা পাপ।
কলম আমার মাধ্যম, মানবতা আমার পরিচয়—
এই বিশ্বাস বুকে নিয়েই আমি এগিয়ে যেতে চাই,
গণমানুষের কণ্ঠ হয়ে,
তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে,
তাদের অশ্রু আর হাসির অংশীদার হয়ে।
শেষ পর্যন্ত আমি এই কথাটাই বলতে চাই—মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে নয়, মানুষের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পেতে চাই।
যে চোখে জল আছে, সেই চোখের পাশে দাঁড়াতে চাই। যে কণ্ঠে শব্দ নেই, সেই কণ্ঠের ভাষা হতে চাই।
দেশপ্রম আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে গোটা দেশের আপামর সাধারণ ও অসাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে আমি একজন অপাঙক্তেয় ও নগণ্য মানুষ হিসেবে বিনম্র চিত্তে সবিনয় মিনতি করছি- আসুন ছিন্নমূল এইসব মানুষের পাশে দাঁড়াই। আমরা সবাই মিলে কাজ করি। যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব। ভালোবাসার বিজয় হোক, বিজয় হোক মানবতার, বিজয় হোক আমাদের দেশপ্রেমের। স্বপ্নসারথী হয়ে পাশে দাঁড়াই দুঃখী মানুষের।
আমাদের হৃদ্যতায় এমন দিন আসুক, যেদিন বিজয়ের করতালি দেবে অসংখ্য দূতপরী। ইথারে আর ভেসে আসবে না কান্নার মিহি সুর। রোজ ভোরে আর মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে শুনব না একটি শোক সংবাদ, একটি মৃত্যু সংবাদ। রোজ সকালে জেগে উঠে যেন অনুভব করি, ভুবন ডাঙ্গার উদাসী শিহরণ। ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হোক নবযৌবনে ফিরে পাওয়া জীবনের জয়গান গাওয়া মানুষের কলতান। সংগ্রামী জীবনের অণুবচন হোক আরও বেশি অনুজ্ঞাময়।
জীবন যুদ্ধে পরাজিত ফসিলগুলো পুনর্জীবন ফিরে পাক মহাকালের অনন্ত যাত্রায় মহিমান্বিত মানব রূপে। হিংসা আর বৈষম্য নিপাত যাক। ভালোবাসা জিন্দাবাদ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬
এক হাতে কলম আর অন্য হাতে মানবতার অঙ্গীকার—এই দুই শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই হাঁটতে চাই সেই সব মানুষের ভিড়ে, যাঁদের গল্প আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকলেও খুব কমই আলোয় আসে। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম লেখা থাকে না, সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনামেও তাঁরা জায়গা পায় না; অথচ তাঁরাই এই সমাজের নীরব ভিত্তি, অদৃশ্য শক্তি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সংবাদ মানে কেবল তথ্যের পরিসংখ্যান নয়। সংবাদ মানে মানুষের গল্পের কান্না, হাসি, সংগ্রাম, বেদনা আর স্বপ্নের এক জীবন্ত ঠিকানা।
আমরা যখন উন্নয়নের গল্প বলি, তখন চোখে ভাসে উঁচু দালান, আলোকিত শহর, আধুনিক জীবনযাত্রা। কিন্তু সেই আলোয় ঢাকা পড়ে যায় এক বিশাল অন্ধকার - একটি ভিন্ন বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিদিন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে, প্রতিটি দিন যেখানে এক একটি যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের নেই কোনো করতালি, নেই কোনো সংবাদ সম্মেলন - আছে শুধু নীরব সহ্যশক্তি আর অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
এই দেশে আজও এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে একজন মানুষের এক দিনের উপার্জন বন্ধ মানেই পুরো পরিবারের না খেয়ে থাকা। এমন অসংখ্য রাত আছে, যেখানে ক্ষুধা আর ক্লান্তির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে মানুষ। বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘরে, রাস্তার ধারে, কোনো অচেনা কোণে - অসংখ্য স্বপ্ন প্রতিদিন জন্ম নেয়, আবার প্রতিদিনই নিঃশব্দে ভেঙে যায়।
তবুও এই মানুষগুলো হারে না। পেটে পাথর বেঁধে, চোখে অদৃশ্য জল নিয়ে, বুকভরা কষ্ট লুকিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকে।
একটি রুটি ভাগ করে খেয়েও যাঁরা পুরো দিন পার করে দেয়, তাঁদের মুখে আপনি অভিযোগ শুনবেন না; বরং দেখবেন এক অদ্ভুত শান্তি, এক অদম্য আত্মসম্মান। চাল নেই, চুলো নেই - তবুও মাথা উঁচু করে বাঁচার যে শক্তি, তা আমাদের অনেকেরই নেই। এরা হাত পাততে জানে না, এরা হাল ছাড়তে জানে না।
অদ্ভুত এক গল্প - যাদের কিছুই নেই, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি দেয়।
নিজের কষ্ট ভুলে অন্যের বিপদে ছুটে আসে, নিজের ক্ষুধা ভুলে অন্যকে খেতে দেয়, নিজের নিরাপত্তা ভুলে অন্যকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে যখনই কোনো দুর্যোগ নেমে আসে - হোক তা বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অগ্নিকাণ্ড—সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয় এই প্রান্তিক মানুষগুলোই। রাতারাতি ভেসে যায় তাদের ঘরবাড়ি, হারিয়ে যায় জীবিকার শেষ সম্বলটুকু। কেউ আশ্রয় নেয় বাঁধের ওপর, কেউ স্কুলঘরের এক কোণে, কেউবা খোলা আকাশের নিচে। পরিবার নিয়ে তারা অনিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের দিকে।
দুর্যোগ শেষে সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলে যায়। তবে তাদের জীবন আর আগের জায়গায় ফিরে যায় না। নতুন করে শুরু করার মতো পুঁজি তাদের থাকে না, তবুও তাঁরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে—অদম্য সাহস আর বেঁচে থাকার জেদ নিয়েই। এসব বিপর্যস্ত মানুষের কান্না, তাঁদের হারানোর বেদনা আর নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম—এসবই আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা, যা বারবার আমাদের চাকচিক্যময় জীবনের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
আমরা অনেক সময় এই মানুষগুলোকে অবহেলা করি, তুচ্ছ ভাবি, তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাই। কিন্তু সত্যটা হলো—আমাদের আরাম, আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য, আমাদের এই তথাকথিত ‘কমফোর্ট জোন’ গড়ে উঠেছে তাঁদের অগণিত ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে। তাঁরা হাসিমুখে নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে।
এ সকল মানুষের গল্প যখন আমার কলমে ধরা পড়ে, তখন হৃদয়ে এক অদ্ভুত ঝড় ওঠে। মনে পড়ে বিদ্রোহী কবি প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম এর সেই জাগরণী আহ্বান—
“আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?,
তোমার ছেলে উঠলে মাগো, রাত পোহাবে তবে।”
এই পঙক্তি যেন শুধু কবিতা নয়—এটি এক ডাক, এক শপথ, এক দায়িত্ব।
তখন মনে হয়, শুধু লিখে গেলেই হবে না।
আমি শুধু লিখতে চাই না—আমি পাশে দাঁড়াতে চাই।
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি চাই, আমার কলম কেবল গল্প বলবে না - মানুষের কষ্টের কাছে পৌঁছাবে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি হয়ে উঠবে। আমি চাই, ক্যামেরার লেন্স শুধু ছবি তুলবে না - মানুষের যন্ত্রণা ধারণ করে সমাজকে নাড়িয়ে দেবে।
আমি ছুঁতে চাই সেই বাস্তবতা—
যেখানে এক মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ক্ষুধা ভুলে যায়,
যেখানে এক শ্রমিক ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবারও পরদিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়,
যেখানে এক শিশু স্বপ্ন দেখতে শেখার আগেই বাস্তবতার কঠিন পাঠ শিখে নেয়।
আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই—
তাঁদের কষ্টের সময়,
তাঁদের লড়াইয়ের মুহূর্তে,
তাঁদের ক্ষুদ্র সুখের দিনগুলোতে।
আমি বিশ্বাস করি, একজন সাংবাদিক কেবল ঘটনার বর্ণনাকারী নন - তিনি সমাজের দর্পণ, বিবেক, মানুষের কণ্ঠস্বর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক প্রতিবাদ। তাই আমার দায়িত্ব শুধু রিপোর্ট লেখা নয়; আমার দায়িত্ব অনুভব করা, উপলব্ধি করা এবং প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করা।
হয়তো আমি একা পৃথিবী বদলে দিতে পারব না।
কিন্তু আমি একজন মানুষের কষ্ট তুলে ধরতে পারি,
একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি,
একটি নীরব গল্পকে কণ্ঠ দিতে পারি।
আর কখনও কখনও একটি সত্য গল্পই যথেষ্ট—পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
আমরা তো সেই জাতি! যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে স্বাধীনতা। সেই ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে - ঐক্য আর সহমর্মিতার শক্তির গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।
তাহলে কেনো আমরা পারব না?
কেনো আমরা পারব না এই বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিতে?
কেনো আমরা পারব না একজন মানুষের চোখের জল মুছে দিতে?
হয়তো আমাদের সবার কাছে বিপুল অর্থ-সম্পদ নেই, কিন্তু আমাদের আছে মানবতা, আছে মমত্ববোধ, আছে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। আমাদের আছে একটি সহানুভূতিশীল, সাহসী এবং মানবিক হৃদয়। এই হৃদয়ই পারবে একদিন সবকিছু বদলে দিতে।
আমি লিখব—কারণ সত্য বলা প্রয়োজন।
আমি দাঁড়াব—কারণ মানুষের পাশে থাকা প্রয়োজন।
আমি লড়ব—কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা পাপ।
কলম আমার মাধ্যম, মানবতা আমার পরিচয়—
এই বিশ্বাস বুকে নিয়েই আমি এগিয়ে যেতে চাই,
গণমানুষের কণ্ঠ হয়ে,
তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে,
তাদের অশ্রু আর হাসির অংশীদার হয়ে।
শেষ পর্যন্ত আমি এই কথাটাই বলতে চাই—মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে নয়, মানুষের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পেতে চাই।
যে চোখে জল আছে, সেই চোখের পাশে দাঁড়াতে চাই। যে কণ্ঠে শব্দ নেই, সেই কণ্ঠের ভাষা হতে চাই।
দেশপ্রম আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে গোটা দেশের আপামর সাধারণ ও অসাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে আমি একজন অপাঙক্তেয় ও নগণ্য মানুষ হিসেবে বিনম্র চিত্তে সবিনয় মিনতি করছি- আসুন ছিন্নমূল এইসব মানুষের পাশে দাঁড়াই। আমরা সবাই মিলে কাজ করি। যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব। ভালোবাসার বিজয় হোক, বিজয় হোক মানবতার, বিজয় হোক আমাদের দেশপ্রেমের। স্বপ্নসারথী হয়ে পাশে দাঁড়াই দুঃখী মানুষের।
আমাদের হৃদ্যতায় এমন দিন আসুক, যেদিন বিজয়ের করতালি দেবে অসংখ্য দূতপরী। ইথারে আর ভেসে আসবে না কান্নার মিহি সুর। রোজ ভোরে আর মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে শুনব না একটি শোক সংবাদ, একটি মৃত্যু সংবাদ। রোজ সকালে জেগে উঠে যেন অনুভব করি, ভুবন ডাঙ্গার উদাসী শিহরণ। ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হোক নবযৌবনে ফিরে পাওয়া জীবনের জয়গান গাওয়া মানুষের কলতান। সংগ্রামী জীবনের অণুবচন হোক আরও বেশি অনুজ্ঞাময়।
জীবন যুদ্ধে পরাজিত ফসিলগুলো পুনর্জীবন ফিরে পাক মহাকালের অনন্ত যাত্রায় মহিমান্বিত মানব রূপে। হিংসা আর বৈষম্য নিপাত যাক। ভালোবাসা জিন্দাবাদ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ।

আপনার মতামত লিখুন