দৃষ্টি প্রতিদিন

দাসত্ব নয়, নিজের ইচ্ছেই হতে পারে আগামীর হাতিয়ার

দাসত্ব নয়, নিজের ইচ্ছেই হতে পারে আগামীর হাতিয়ার
নাহিদ হাসান রবিন

​বেকারত্বকে অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করার সনাতন ধারণাটি আজ অত্যন্ত জীর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় একে বরং একটি প্রবল প্রাণশক্তির স্থবিরতা বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির নীরবতার সঙ্গে তুলনা করা চলে। আমাদের চারপাশর শিক্ষিত তরুণদর বিশাল একটি অংশ যখন কবল একটি নির্দিষ্ট দাপ্তরিক পদর আশায় প্রহর গান, তখন তাদর ভতর থাকা অসীম সজনশীলতা ধুলাবালি পড় ফিক হয় যায়। প্রকত অর্থ, শিক্ষার মূল নির্যাস হলা মানুষর চিÍার বদ্ধ দুয়ারগুলা খুল দওয়া এবং তার মানসিকতার দিগÍক প্রসারিত করা। জ্ঞান অর্জনর সার্থকতা কেবল একটি নিটোল চাকরি প্রাপ্তির মাঝে লুকিয়ে নেই; বরং তা লুকিয়ে আছে জীবনের প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করার সাহসে। আমরা যখন পড়াশোনা করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক শাণিত হয় নতুন কিছু উদ্ভাবন করার জন্য, অন্যের আজ্ঞাবহ হয়ে জীবন পার করার জন্য নয়। শিক্ষার আলো যদি মনের অন্ধকার ও হীনম্মন্যতা দূর করতে না পারে, তবে সেই পা-িত্য কেবল একটি ভারী বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​এই জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় যে অস্ত্রের প্রয়োজন, তা হলো মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি হলো এমন এক অদৃশ্য জ্বালানি, যা মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগায়। যার ভেতরে আকাশ ছোঁয়ার প্রবল ইচ্ছে আছে, তাকে কোনো দেয়ালই আটকে রাখতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব উদ্ভাবনের মূলে ছিল একক কোনো মানুষের প্রবল জেদ। একজন মানুষের যদি নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে এবং তার যদি লক্ষ্য অর্জনের তীব্র আকাক্সক্ষা থাকে, তবে অভাব কিংবা প্রতিকলতা তার পথ কানা বাধা হয় দাঁড়াত পার না। ইছাশক্তি থাকল শূন্য হাতও বিশাল সাম্রাজ্যর স্বপ দখা যায়, আর ইছ না থাকল অঢল সুযাগর মাঝও মানুষ ¯বির হয় থাক। তাই বকারত্ব ঘাচানার প্রথম পাঠ হলা নিজর মনর ভতর সই সুপ্ত সম্ভাবনাক জাগিয় তালা, যা পরাজয় মানত নারাজ।

​বিশ্বের মানচিত্রে তাকালে আমরা এমন অনেক কিংবদন্তির দেখা পাই, যারা চাকরির মোহ ত্যাগ করে নিজের সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে বিশ্বজয় করেছেন। আজ আমরা যে প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর সুবিধা ভোগ করছি, তার নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর অনেকেই তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির পেছনে ছোটেননি। কেউ নিজর বাড়ির গ্যারজ বস পথিবীর শ্রষ্ঠ কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ছন, কউ আবার বিশ্ববিদ্যালয় ছড় দিয় সামাজিক যাগাযাগর নতুন জগত তরি করছন। এদর সবার সাধারণ বশিষ্ট্য ছিল তারা অন্যর অধীন কাজ করার চয় নিজর স্বপক বাস্তব রপ দওয়াক বশি প্রাধান্য দিয়ছিলন। শুধু বিদশ কন, আমাদর নিজ দশও এমন অনক উদাহরণ রয়ছ। কত তরুণ আজ চাষবাসর আধুনিকীকরণ কর সফল খামারি হিসব আত্মপ্রকাশ করছন। তারা প্রমাণ করছন য, একখ- উর্বর জমি আর অদম্য ইছাশক্তি থাকল একটি নিয়াগপত্রর জন্য করুণা ভিক্ষা করার প্রয়াজন পড় না। যারা আজ হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করছেন, তাদের শুরুটাও ছিল অতি সামান্য। তারা আমাদের শেখায় যে, নিজের ইচ্ছেটাই হলো আসল পুঁজি।

​চাকরি না পাওয়াকে যারা জীবনের অন্তিম পরাজয় মনে করেন, তারা আসলে নিজেদের ক্ষমতার পরিধি সম্পর্কে সচেতন নন। কোনো কোনো যুবক চাকরি না পেয়ে অন্য কানা সজনশীল পশা বা বাণিজ্য নামত এক ধরণর আত্মগ্লানি বা লজ্জাবাধ করন। এই লজ্জাই হলা উনতির পথ সবচয় বড় বাধা। য হাত দিয় কলম চালানা শখা হয়ছ, সই হাত যদি লাঙল ধর কিংবা কানা নতুন সামগ্রী তরির কারখানায় য¿ ঘার, তব তাত হীনম্মন্যতার কিছু নই। লজ্জা থাকা উচিত অলসতায়, লজ্জা থাকা উচিত পরনির্ভরশীলতায়। শ্রমর কানা জাত নই, কানা ধর্ম নই। ঘাম ঝরানা প্রতিটি বিদু যখন মাটিত পড়, তখন তা কবল ফসলর জন্ম দয় না, বরং এক একজন যাদ্ধার বীরত্বগাথা লখ। পরগাছা যমন অন্যর ডালপালা বয় বড় ওঠ, কি কানাদিন বনর রাজা হতে পারে না, তেমনি যে মানুষ কেবল অন্যের দেওয়া বেতনের ওপর নির্ভর করে থাকে, সে জীবনের প্রকৃত স্বাধীনতা কোনোদিন উপভোগ করতে পারে না।

​চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনা কোনো উচ্চবেতনভোগী পদের সাথে হতে পারে না। এটি কেবল একটি জীবিকার সংস্থান নয়, বরং এটি একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব। একজন সাহসী উদ্যাক্তা যখন তার ছাট একটি ঘর থক স্বপর বীজ বুনত শুরু করন, তখন তিনি কবল নিজর অনর সং¯ান করন না, বরং তার সই স্বপর মহীরুহর ছায়াতল আরও দশটি পরিবার জীবনর আলা খুঁজ পায়। এই য অন্যর মুখ হাসি ফাটানা এবং সমাজক সচল রাখা, এর চয় বড় গর্বর বিষয় আর কী হত পার? উদ্যাক্তা হওয়ার পথটি হয়তা পুষ্পশয্যা নয়, এই পথ রয়ছ কণ্টকাকীর্ণ বাধা ও অনিশ্চয়তা। কি এই কণ্টকাকীর্ণ পথ পার হওয়ার পরই য দিগÍর দখা মল, তার সদর্য অতুলনীয়। নিজর মধা আর অদম্য জদক পুঁজি কর যখন কেউ একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করায়, তখন সে আর ভিড়ের অংশ থাকে না, সে নিজেই একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।

​আর্থিক অস্বচ্ছলতা অনেক সময় উদ্যমী প্রাণের সামনে হিমালয়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের সংকল্পের কাছে পাথরও হার মানে। পুঁজির অভাব বড় বাধা হতে পারে, কিন্তু তা পথচলা থামিয়ে দেওয়ার কোনো অজুহাত হতে পারে না। যার সঠিক পরিকল্পনা আছে এবং যার চোখে সফল হওয়ার নেশা আছে, তার জন্য পৃথিবী নিজেই পথ তৈরি করে দেয়। বর্তমানে সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ বা যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বড় বড় অসম্ভবকে জয় করা সম্ভব হচ্ছে। একা যদি কোনো বিশাল পাথর সরানো না যায়, তবে দশটি সমমনা হাত এক হলে তা নিমেষেই সম্ভব হয়। এছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ও ঋণের সুব্যবস্থা রয়েছে, যা একজন নতুন কর্মবীরকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু ঋণের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো অদম্য স্পৃহা। শুরুটা ছোট পরিসরে করলে ভুলের মাসুলও কম দিতে হয় এবং কাজ শেখার সুযোগ মেলে প্রচুর।

​সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট রাজপথ নেই; প্রতিটি মানুষ নিজেই নিজের পথের নির্মাতা। আমাদের সমাজের চোখে তুচ্ছ এমন অনেক কাজ আছে, যা শিক্ষিত মানুষের ছোঁয়ায় এক একটি অভাবনীয় শিল্পে পরিণত হতে পারে। কৃষিকে কেবল কাদা-মাটির কাজ মনে না করে যদি আধুনিক প্রযুক্তি আর সৃজনশীলতার সমন্বয়ে একে একটি আধুনিক শিল্পে রূপান্তর করা যায়, তবে তা থেকে অঢেল সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। আসলে সমস্যাটা কর্মের নয়, সমস্যাটা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা যখন শ্রমের মর্যাদাকে অস্বীকার করি, তখনই আমরা সভ্যতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ি। যে ব্যক্তি নিজের মেধা দিয়ে একটি নতুন পথ তৈরি করে এবং আরও মানুষকে সেই পথে চলার সুযোগ করে দেয়, সে-ই হলো আধুনিক যুগের প্রকৃত ঋষি।

​স্বনির্ভরতার এই আলোকযাত্রায় জয়ী হতে হলে প্রথমেই মনের ভেতরের ভীরুতাকে বিসর্জন দিতে হবে। লজ্জা, ভয় আর দ্বিধা এই তিনটিই হলো সফলতার প্রধান শত্রু। যে ব্যক্তি অন্যের সমালোচনাকে ভয় পায়, সে কোনোদিন বড় কিছু করতে পারে না। মানুষ যা বলে বলুক, আপনার লক্ষ্য যদি স্থির থাকে তবে একদিন সেই সমালোচকেরাই আপনার সাফল্যের জয়গান গাইবে। নিজের উদ্যোগকে সন্তানের মতো ভালোবাসুন, তাকে সময় দিন, তাকে সযতেœ লালন করুন। মনে রাখবেন, রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততই নিকটবর্তী হয়। বেকারত্বের রজনী পেরিয়ে যে সূর্যের দেখা পাওয়া যায়, তা কেবল নিজের জীবনকে নয় বরং পুরো জাতিকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে।

​আসুন, আমরা হীনম্মন্যতার শেকল ছিঁড়ে ফেলি। আমাদের হাতগুলো অলস বসে থাকার জন্য নয়, বরং এই জগতকে নতুন করে সাজানোর জন্য। নিজের ইচ্ছেটাকে আকাশ সমান বড় করুন, দেখবেন মেঘ কেটে রোদ উঠবেই। শ্রমের মর্যাদা দিয়ে, সঠিক পরিকল্পনায় নিজের ভাগ্য নিজে গড়ি। স্বনির্ভরতার এই মন্ত্রই হোক আমাদের জীবনের মূল চালিকাশক্তি। নিজের ওপর আস্থা রাখুন, সৃজনশীলতার চর্চা করুন; দেখবেন জীবন এক আনন্দময় সার্থকতায় ভরে উঠবে। এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা, এই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার দৃপ্ত অঙ্গীকার। নিজের স্বপ্নের কাছে দায়বদ্ধ হওয়াই হলো প্রকৃত বীরত্ব। যখন আপনি নিজেকে জয় করতে শিখবেন, তখন গোটা পৃথিবী আপনার সামনে নতি স্বীকার করবে। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম, এটাই স্বনির্ভরতার চিরন্তন দর্শন।

নাহিদ হাসান রবিন

লেখক কলামিস্ট এবং সাংবাদিক 

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৃষ্টি প্রতিদিন

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


দাসত্ব নয়, নিজের ইচ্ছেই হতে পারে আগামীর হাতিয়ার

প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

​বেকারত্বকে অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করার সনাতন ধারণাটি আজ অত্যন্ত জীর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় একে বরং একটি প্রবল প্রাণশক্তির স্থবিরতা বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির নীরবতার সঙ্গে তুলনা করা চলে। আমাদের চারপাশর শিক্ষিত তরুণদর বিশাল একটি অংশ যখন কবল একটি নির্দিষ্ট দাপ্তরিক পদর আশায় প্রহর গান, তখন তাদর ভতর থাকা অসীম সজনশীলতা ধুলাবালি পড় ফিক হয় যায়। প্রকত অর্থ, শিক্ষার মূল নির্যাস হলা মানুষর চিÍার বদ্ধ দুয়ারগুলা খুল দওয়া এবং তার মানসিকতার দিগÍক প্রসারিত করা। জ্ঞান অর্জনর সার্থকতা কেবল একটি নিটোল চাকরি প্রাপ্তির মাঝে লুকিয়ে নেই; বরং তা লুকিয়ে আছে জীবনের প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করার সাহসে। আমরা যখন পড়াশোনা করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক শাণিত হয় নতুন কিছু উদ্ভাবন করার জন্য, অন্যের আজ্ঞাবহ হয়ে জীবন পার করার জন্য নয়। শিক্ষার আলো যদি মনের অন্ধকার ও হীনম্মন্যতা দূর করতে না পারে, তবে সেই পা-িত্য কেবল একটি ভারী বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​এই জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় যে অস্ত্রের প্রয়োজন, তা হলো মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি হলো এমন এক অদৃশ্য জ্বালানি, যা মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগায়। যার ভেতরে আকাশ ছোঁয়ার প্রবল ইচ্ছে আছে, তাকে কোনো দেয়ালই আটকে রাখতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব উদ্ভাবনের মূলে ছিল একক কোনো মানুষের প্রবল জেদ। একজন মানুষের যদি নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে এবং তার যদি লক্ষ্য অর্জনের তীব্র আকাক্সক্ষা থাকে, তবে অভাব কিংবা প্রতিকলতা তার পথ কানা বাধা হয় দাঁড়াত পার না। ইছাশক্তি থাকল শূন্য হাতও বিশাল সাম্রাজ্যর স্বপ দখা যায়, আর ইছ না থাকল অঢল সুযাগর মাঝও মানুষ ¯বির হয় থাক। তাই বকারত্ব ঘাচানার প্রথম পাঠ হলা নিজর মনর ভতর সই সুপ্ত সম্ভাবনাক জাগিয় তালা, যা পরাজয় মানত নারাজ।

​বিশ্বের মানচিত্রে তাকালে আমরা এমন অনেক কিংবদন্তির দেখা পাই, যারা চাকরির মোহ ত্যাগ করে নিজের সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে বিশ্বজয় করেছেন। আজ আমরা যে প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর সুবিধা ভোগ করছি, তার নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর অনেকেই তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির পেছনে ছোটেননি। কেউ নিজর বাড়ির গ্যারজ বস পথিবীর শ্রষ্ঠ কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ছন, কউ আবার বিশ্ববিদ্যালয় ছড় দিয় সামাজিক যাগাযাগর নতুন জগত তরি করছন। এদর সবার সাধারণ বশিষ্ট্য ছিল তারা অন্যর অধীন কাজ করার চয় নিজর স্বপক বাস্তব রপ দওয়াক বশি প্রাধান্য দিয়ছিলন। শুধু বিদশ কন, আমাদর নিজ দশও এমন অনক উদাহরণ রয়ছ। কত তরুণ আজ চাষবাসর আধুনিকীকরণ কর সফল খামারি হিসব আত্মপ্রকাশ করছন। তারা প্রমাণ করছন য, একখ- উর্বর জমি আর অদম্য ইছাশক্তি থাকল একটি নিয়াগপত্রর জন্য করুণা ভিক্ষা করার প্রয়াজন পড় না। যারা আজ হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করছেন, তাদের শুরুটাও ছিল অতি সামান্য। তারা আমাদের শেখায় যে, নিজের ইচ্ছেটাই হলো আসল পুঁজি।

​চাকরি না পাওয়াকে যারা জীবনের অন্তিম পরাজয় মনে করেন, তারা আসলে নিজেদের ক্ষমতার পরিধি সম্পর্কে সচেতন নন। কোনো কোনো যুবক চাকরি না পেয়ে অন্য কানা সজনশীল পশা বা বাণিজ্য নামত এক ধরণর আত্মগ্লানি বা লজ্জাবাধ করন। এই লজ্জাই হলা উনতির পথ সবচয় বড় বাধা। য হাত দিয় কলম চালানা শখা হয়ছ, সই হাত যদি লাঙল ধর কিংবা কানা নতুন সামগ্রী তরির কারখানায় য¿ ঘার, তব তাত হীনম্মন্যতার কিছু নই। লজ্জা থাকা উচিত অলসতায়, লজ্জা থাকা উচিত পরনির্ভরশীলতায়। শ্রমর কানা জাত নই, কানা ধর্ম নই। ঘাম ঝরানা প্রতিটি বিদু যখন মাটিত পড়, তখন তা কবল ফসলর জন্ম দয় না, বরং এক একজন যাদ্ধার বীরত্বগাথা লখ। পরগাছা যমন অন্যর ডালপালা বয় বড় ওঠ, কি কানাদিন বনর রাজা হতে পারে না, তেমনি যে মানুষ কেবল অন্যের দেওয়া বেতনের ওপর নির্ভর করে থাকে, সে জীবনের প্রকৃত স্বাধীনতা কোনোদিন উপভোগ করতে পারে না।

​চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতা হওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনা কোনো উচ্চবেতনভোগী পদের সাথে হতে পারে না। এটি কেবল একটি জীবিকার সংস্থান নয়, বরং এটি একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব। একজন সাহসী উদ্যাক্তা যখন তার ছাট একটি ঘর থক স্বপর বীজ বুনত শুরু করন, তখন তিনি কবল নিজর অনর সং¯ান করন না, বরং তার সই স্বপর মহীরুহর ছায়াতল আরও দশটি পরিবার জীবনর আলা খুঁজ পায়। এই য অন্যর মুখ হাসি ফাটানা এবং সমাজক সচল রাখা, এর চয় বড় গর্বর বিষয় আর কী হত পার? উদ্যাক্তা হওয়ার পথটি হয়তা পুষ্পশয্যা নয়, এই পথ রয়ছ কণ্টকাকীর্ণ বাধা ও অনিশ্চয়তা। কি এই কণ্টকাকীর্ণ পথ পার হওয়ার পরই য দিগÍর দখা মল, তার সদর্য অতুলনীয়। নিজর মধা আর অদম্য জদক পুঁজি কর যখন কেউ একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করায়, তখন সে আর ভিড়ের অংশ থাকে না, সে নিজেই একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।

​আর্থিক অস্বচ্ছলতা অনেক সময় উদ্যমী প্রাণের সামনে হিমালয়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের সংকল্পের কাছে পাথরও হার মানে। পুঁজির অভাব বড় বাধা হতে পারে, কিন্তু তা পথচলা থামিয়ে দেওয়ার কোনো অজুহাত হতে পারে না। যার সঠিক পরিকল্পনা আছে এবং যার চোখে সফল হওয়ার নেশা আছে, তার জন্য পৃথিবী নিজেই পথ তৈরি করে দেয়। বর্তমানে সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ বা যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বড় বড় অসম্ভবকে জয় করা সম্ভব হচ্ছে। একা যদি কোনো বিশাল পাথর সরানো না যায়, তবে দশটি সমমনা হাত এক হলে তা নিমেষেই সম্ভব হয়। এছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ও ঋণের সুব্যবস্থা রয়েছে, যা একজন নতুন কর্মবীরকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু ঋণের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো অদম্য স্পৃহা। শুরুটা ছোট পরিসরে করলে ভুলের মাসুলও কম দিতে হয় এবং কাজ শেখার সুযোগ মেলে প্রচুর।

​সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট রাজপথ নেই; প্রতিটি মানুষ নিজেই নিজের পথের নির্মাতা। আমাদের সমাজের চোখে তুচ্ছ এমন অনেক কাজ আছে, যা শিক্ষিত মানুষের ছোঁয়ায় এক একটি অভাবনীয় শিল্পে পরিণত হতে পারে। কৃষিকে কেবল কাদা-মাটির কাজ মনে না করে যদি আধুনিক প্রযুক্তি আর সৃজনশীলতার সমন্বয়ে একে একটি আধুনিক শিল্পে রূপান্তর করা যায়, তবে তা থেকে অঢেল সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। আসলে সমস্যাটা কর্মের নয়, সমস্যাটা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা যখন শ্রমের মর্যাদাকে অস্বীকার করি, তখনই আমরা সভ্যতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ি। যে ব্যক্তি নিজের মেধা দিয়ে একটি নতুন পথ তৈরি করে এবং আরও মানুষকে সেই পথে চলার সুযোগ করে দেয়, সে-ই হলো আধুনিক যুগের প্রকৃত ঋষি।

​স্বনির্ভরতার এই আলোকযাত্রায় জয়ী হতে হলে প্রথমেই মনের ভেতরের ভীরুতাকে বিসর্জন দিতে হবে। লজ্জা, ভয় আর দ্বিধা এই তিনটিই হলো সফলতার প্রধান শত্রু। যে ব্যক্তি অন্যের সমালোচনাকে ভয় পায়, সে কোনোদিন বড় কিছু করতে পারে না। মানুষ যা বলে বলুক, আপনার লক্ষ্য যদি স্থির থাকে তবে একদিন সেই সমালোচকেরাই আপনার সাফল্যের জয়গান গাইবে। নিজের উদ্যোগকে সন্তানের মতো ভালোবাসুন, তাকে সময় দিন, তাকে সযতেœ লালন করুন। মনে রাখবেন, রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততই নিকটবর্তী হয়। বেকারত্বের রজনী পেরিয়ে যে সূর্যের দেখা পাওয়া যায়, তা কেবল নিজের জীবনকে নয় বরং পুরো জাতিকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে।

​আসুন, আমরা হীনম্মন্যতার শেকল ছিঁড়ে ফেলি। আমাদের হাতগুলো অলস বসে থাকার জন্য নয়, বরং এই জগতকে নতুন করে সাজানোর জন্য। নিজের ইচ্ছেটাকে আকাশ সমান বড় করুন, দেখবেন মেঘ কেটে রোদ উঠবেই। শ্রমের মর্যাদা দিয়ে, সঠিক পরিকল্পনায় নিজের ভাগ্য নিজে গড়ি। স্বনির্ভরতার এই মন্ত্রই হোক আমাদের জীবনের মূল চালিকাশক্তি। নিজের ওপর আস্থা রাখুন, সৃজনশীলতার চর্চা করুন; দেখবেন জীবন এক আনন্দময় সার্থকতায় ভরে উঠবে। এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা, এই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার দৃপ্ত অঙ্গীকার। নিজের স্বপ্নের কাছে দায়বদ্ধ হওয়াই হলো প্রকৃত বীরত্ব। যখন আপনি নিজেকে জয় করতে শিখবেন, তখন গোটা পৃথিবী আপনার সামনে নতি স্বীকার করবে। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম, এটাই স্বনির্ভরতার চিরন্তন দর্শন।

নাহিদ হাসান রবিন

লেখক কলামিস্ট এবং সাংবাদিক 



দৃষ্টি প্রতিদিন

প্রকাশক ও সম্পাদক এসএম আমিনুল মোমিন, আইন বিষয়ক সম্পাদক, অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান


কপিরাইট © ২০২৬ দৃষ্টি প্রতিদিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত