সবুজ প্রকৃতি আর শান্ত জনপদের এক মফস্বল শহর বগুড়ার শেরপুর। এখান থেকেই ডানা মেলেছে এক অদম্য সুর-স্বপ্ন। ভোরের কুয়াশাভেজা মেঠো পথ কিংবা বিকেলে বাঁশঝাড়ের মর্মর ধ্বনিকে ছাপিয়ে যখন কোনো কিশোরের কণ্ঠে নিখুঁত তানপুরা বেজে ওঠে, তখন বোঝা যায়- সুরের কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকে না, যেমন থাকে না শরতের বাতাসের কোনো সীমানা। সা-রে-গা-মা-পা’র অমোঘ সুর যখন শেরপুরের ধুলোমাখা নিভৃত কোণে প্রাণ পায়, তখন বড় শহরের যান্ত্রিক চাকচিক্যও ম্লান হয়ে যায়। আর এই সুরের জাদুকর রেজওয়ান হাসান শিশির। যার কণ্ঠের প্রতিটি কম্পন আজ প্রমাণ করছে, প্রতিভা যদি খাঁটি হয় আর লক্ষ্য যদি হয় ধ্রুবতারার মতো স্থির, তবে মফঃস্বল কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং এটি সৃজনশীলতার এক বিশাল ভাণ্ডার।
শিশিরের এই সুরের পথে অভিষেক ঘটেছিল এক অলৌকিক লগ্নে, যখন সে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মাত্র আট বছর বয়সেই তার কণ্ঠে সুরের মায়া এসে ভর করে, ঠিক যেন শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির স্নিগ্ধ পরশ। তবে কেবল মুগ্ধতা নয়, শিশিরের সঙ্গীত জীবনের সবচেয়ে মহিমান্বিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছে ওস্তাদ আব্দুল আলীমের তালিম আর কঠোর শাসনে। ওস্তাদের রাগ-রাগিণীর দীক্ষায় শিশির নিজেকে নিংড়ে দিয়েছে সুরের গহীনে, যেমন করে ঝিনুক নিজের ভেতরে তিল তিল করে মুক্তা গড়ে তোলে। আর এই দীর্ঘ বন্ধুর যাত্রায় প্রদীপের শিখার মতো নিরবচ্ছিন্ন আলো জ্বেলে পাশে আছেন তার মা- রেশমা আক্তার। মায়ের অদম্য ইচ্ছে আর প্রেরণা আজ শিশিরকে মফঃস্বলের নিভৃত কোল থেকে টেনে এনে জাতীয় পর্যায়ের এক দীপ্তমান শিখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মফঃস্বলের এই বিস্ময়-বালক নিজেকে কেবল ব্যাকরণের নিগড়ে বেঁধে রাখেনি। সে যেমন ধ্রুপদী সঙ্গীতের কঠিন অলংকারে অভিজ্ঞ শ্রোতাদের আবিষ্ট করতে পারে, তেমনি লোকসঙ্গীতের মাটির ঘ্রাণে মুহূর্তেই জাগিয়ে তোলে শেকড়ের টান। তার কণ্ঠ যেন তখন পাহাড়ী ঝর্ণার মতো স্বচ্ছ ও সাবলীল। তার অর্জনের খাতা ওল্টালে যে কেউ বিস্ময়ে থমকে যাবেন। ৪টি সুপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় পুরস্কার ও স্বর্ণপদকসহ উপজেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে শিশির এ পর্যন্ত অর্জন করেছে কয়েক ডজন পুরস্কার। দেশের প্রধানতম টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর রিয়েলিটি শো-তে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরা থেকে শুরু করে জাতীয় মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান দখল করা, এ সবই তার একনিষ্ঠ সাধনার সাক্ষ্য দেয়। দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষারত শিশিরের এই জয়যাত্রা আসলে মফঃস্বলের এক নিঃশব্দ বিপ্লব। এটি বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বগুড়া শেরপুরের সেই সাধারণ ধুলোমাখা পথ থেকে শুরু হওয়া গান, রাজধানী ছাড়িয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনি তুলতে পারে। শিশির আজ সেই বলিষ্ঠ নক্ষত্র, যা মুঠোর ভেতর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে জানান দিচ্ছে- প্রান্তিক জনপদ এখন আর কোনো অন্ধকার দ্বীপ নয়, বরং এটিই প্রকৃত উদয়স্থল।

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬
সবুজ প্রকৃতি আর শান্ত জনপদের এক মফস্বল শহর বগুড়ার শেরপুর। এখান থেকেই ডানা মেলেছে এক অদম্য সুর-স্বপ্ন। ভোরের কুয়াশাভেজা মেঠো পথ কিংবা বিকেলে বাঁশঝাড়ের মর্মর ধ্বনিকে ছাপিয়ে যখন কোনো কিশোরের কণ্ঠে নিখুঁত তানপুরা বেজে ওঠে, তখন বোঝা যায়- সুরের কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকে না, যেমন থাকে না শরতের বাতাসের কোনো সীমানা। সা-রে-গা-মা-পা’র অমোঘ সুর যখন শেরপুরের ধুলোমাখা নিভৃত কোণে প্রাণ পায়, তখন বড় শহরের যান্ত্রিক চাকচিক্যও ম্লান হয়ে যায়। আর এই সুরের জাদুকর রেজওয়ান হাসান শিশির। যার কণ্ঠের প্রতিটি কম্পন আজ প্রমাণ করছে, প্রতিভা যদি খাঁটি হয় আর লক্ষ্য যদি হয় ধ্রুবতারার মতো স্থির, তবে মফঃস্বল কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং এটি সৃজনশীলতার এক বিশাল ভাণ্ডার।
শিশিরের এই সুরের পথে অভিষেক ঘটেছিল এক অলৌকিক লগ্নে, যখন সে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মাত্র আট বছর বয়সেই তার কণ্ঠে সুরের মায়া এসে ভর করে, ঠিক যেন শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির স্নিগ্ধ পরশ। তবে কেবল মুগ্ধতা নয়, শিশিরের সঙ্গীত জীবনের সবচেয়ে মহিমান্বিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছে ওস্তাদ আব্দুল আলীমের তালিম আর কঠোর শাসনে। ওস্তাদের রাগ-রাগিণীর দীক্ষায় শিশির নিজেকে নিংড়ে দিয়েছে সুরের গহীনে, যেমন করে ঝিনুক নিজের ভেতরে তিল তিল করে মুক্তা গড়ে তোলে। আর এই দীর্ঘ বন্ধুর যাত্রায় প্রদীপের শিখার মতো নিরবচ্ছিন্ন আলো জ্বেলে পাশে আছেন তার মা- রেশমা আক্তার। মায়ের অদম্য ইচ্ছে আর প্রেরণা আজ শিশিরকে মফঃস্বলের নিভৃত কোল থেকে টেনে এনে জাতীয় পর্যায়ের এক দীপ্তমান শিখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মফঃস্বলের এই বিস্ময়-বালক নিজেকে কেবল ব্যাকরণের নিগড়ে বেঁধে রাখেনি। সে যেমন ধ্রুপদী সঙ্গীতের কঠিন অলংকারে অভিজ্ঞ শ্রোতাদের আবিষ্ট করতে পারে, তেমনি লোকসঙ্গীতের মাটির ঘ্রাণে মুহূর্তেই জাগিয়ে তোলে শেকড়ের টান। তার কণ্ঠ যেন তখন পাহাড়ী ঝর্ণার মতো স্বচ্ছ ও সাবলীল। তার অর্জনের খাতা ওল্টালে যে কেউ বিস্ময়ে থমকে যাবেন। ৪টি সুপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় পুরস্কার ও স্বর্ণপদকসহ উপজেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে শিশির এ পর্যন্ত অর্জন করেছে কয়েক ডজন পুরস্কার। দেশের প্রধানতম টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর রিয়েলিটি শো-তে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরা থেকে শুরু করে জাতীয় মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান দখল করা, এ সবই তার একনিষ্ঠ সাধনার সাক্ষ্য দেয়। দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষারত শিশিরের এই জয়যাত্রা আসলে মফঃস্বলের এক নিঃশব্দ বিপ্লব। এটি বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বগুড়া শেরপুরের সেই সাধারণ ধুলোমাখা পথ থেকে শুরু হওয়া গান, রাজধানী ছাড়িয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনি তুলতে পারে। শিশির আজ সেই বলিষ্ঠ নক্ষত্র, যা মুঠোর ভেতর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে জানান দিচ্ছে- প্রান্তিক জনপদ এখন আর কোনো অন্ধকার দ্বীপ নয়, বরং এটিই প্রকৃত উদয়স্থল।

আপনার মতামত লিখুন