দৃষ্টি প্রতিদিন
আপডেট : বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মবের চাপ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা

মবের চাপ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়ে থাকে। এই ধারণাটি কেবল একটি অলংকারমূলক শব্দ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের ওপরই বর্তায়। সেই অর্থে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এমন একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত মব সহিংসতা বা জনতার দলবদ্ধ চাপ সৃষ্টি। কোনো সংবাদ প্রকাশের পর যুক্তি, তথ্য বা আইনের পথ অনুসরণ না করে অনেক ক্ষেত্রেই দলবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরা, হুমকি দেওয়া, অপমান করা কিংবা ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপরও সরাসরি আঘাত।

সম্প্রতি রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সেখানে রাস্তা দখল করে নির্মাণকাজ পরিচালনার বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক জাহিদ ইকবালকে ঘিরে একটি মব তৈরি করা হয়। সংবাদটি ছিল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। নগর জীবনে রাস্তা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা একটি গুরুতর সমস্যা এবং এ ধরনের অনিয়ম তুলে ধরা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সেই অনিয়মের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিককেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। তাকে ঘিরে ধরে চাপ সৃষ্টি করা হয়, অপমানজনক আচরণ করা হয় এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয় যাতে ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে নিরুৎসাহিত হন।

এই ঘটনা নতুন নয়; বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। কখনো অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশের কারণে, কখনো ভূমিদস্যুতা বা নদীভাঙন রোধ প্রকল্পে অনিয়মের প্রতিবেদন করার কারণে সাংবাদিকরা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংবাদ প্রকাশের পর একটি সংগঠিত গোষ্ঠী সাংবাদিককে ঘিরে ধরে হুমকি দেয় বা তাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা করে। কোথাও ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে, কোথাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, আবার কোথাও মিথ্যা মামলা বা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে একটি সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। যখন কোনো সংবাদ প্রভাবশালী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত হানে, তখন তারা যুক্তির পথে না গিয়ে শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নেয়। এই শক্তির প্রকাশ ঘটে দলবদ্ধ উপস্থিতির মাধ্যমে—যেখানে সত্য বা তথ্যের পরিবর্তে ভয় এবং চাপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যাকে আমরা মব সংস্কৃতি বলতে পারি।

মব সংস্কৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যুক্তির ভাষা বোঝে না। মব পরিচালিত হয় আবেগ, উত্তেজনা, গুজব এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থের ভিত্তিতে। সেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ধৈর্য থাকে না, নৈতিক বিচারবোধও প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। ফলে কোনো সমাজে যখন মব সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনতার তাৎক্ষণিক বিচার এক ধরনের অঘোষিত শক্তিতে পরিণত হয়।

গণতান্ত্রিক সমাজে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আইনের শাসন, যুক্তির সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর। কিন্তু মব সংস্কৃতি এই তিনটি ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। মবের উপস্থিতিতে যুক্তির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, আইনের শাসন অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। সাংবাদিকরা যখন ভয় ও চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসংযমের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তখন আর প্রকাশ পায় না। দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড সহজেই আড়ালে থেকে যায়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই, কারণ তারা প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘদিন সুস্থভাবে টিকে থাকতে পারে না। সাংবাদিকরা যখন নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তখনই সমাজে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে সাংবাদিকরা যদি হামলা, হুমকি বা মব সহিংসতার ভয়ে আতঙ্কিত থাকেন, তবে সত্য প্রকাশের অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের আলোকে সাংবাদিকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো সংবাদ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার জন্য আইনগত পথ রয়েছে। প্রতিবাদ পাঠানো যেতে পারে, সংশোধনের দাবি করা যেতে পারে, কিংবা প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসব পথ পরিহার করে মব তৈরি করে একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করা আইনের শাসনের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা।

এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের উপর হামলা বা মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ অপরাধীরা যদি মনে করে যে এসব ঘটনার কোনো শাস্তি নেই, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা না থাকলে মব সংস্কৃতি আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে সাংবাদিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা এই পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি। বস্তুনিষ্ঠতা, তথ্য যাচাই, পেশাগত নীতি ও সততার প্রতি কঠোর অঙ্গীকার সাংবাদিকতার ভিত্তিকে দৃঢ় করে। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে যথাযথ অনুসন্ধান নিশ্চিত করা সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত। কারণ সাংবাদিকতার শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই।

তবে এই কথাটিও মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতার ভুল থাকলে তার সমালোচনা বা সংশোধনের পথ রয়েছে। কিন্তু সেই ভুলের অজুহাতে মব তৈরি করে একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; বরং এটি সমাজের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।

নিকুঞ্জের ঘটনাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—আমরা কি সত্যকে যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে মোকাবিলা করব, নাকি জনতার ভয় দেখিয়ে তাকে স্তব্ধ করে দেব? যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একজন সাংবাদিক নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

ইতিহাস আমাদের বারবার একটি সত্য শিখিয়েছে—সত্যকে কখনো স্থায়ীভাবে দমিয়ে রাখা যায় না। তাকে যতই চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হোক, কোনো না কোনো সময় তা নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। তাই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন যুক্তির সংস্কৃতি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আন্তরিক সম্মান।

আজকের বাস্তবতায় আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে আছে মবের সংস্কৃতি—যেখানে উত্তেজনা ও শক্তি প্রদর্শন সত্যকে আড়াল করে দেয়। অন্যদিকে আছে আইনের পথ—যেখানে যুক্তি, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচার সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একটি সভ্য সমাজের জন্য দ্বিতীয় পথটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং এখনই সময় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। মব নয়, আইন; সহিংসতা নয়, যুক্তি—এই নীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ। এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন সাংবাদিক সত্য তুলে ধরার জন্য জনতার বিচারের মুখে পড়বেন না; বরং তার কাজকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে সম্মান করা হবে।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৃষ্টি প্রতিদিন

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬


মবের চাপ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা

প্রকাশের তারিখ : ১১ মার্চ ২০২৬

featured Image

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়ে থাকে। এই ধারণাটি কেবল একটি অলংকারমূলক শব্দ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের ওপরই বর্তায়। সেই অর্থে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এমন একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত মব সহিংসতা বা জনতার দলবদ্ধ চাপ সৃষ্টি। কোনো সংবাদ প্রকাশের পর যুক্তি, তথ্য বা আইনের পথ অনুসরণ না করে অনেক ক্ষেত্রেই দলবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরা, হুমকি দেওয়া, অপমান করা কিংবা ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপরও সরাসরি আঘাত।

সম্প্রতি রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সেখানে রাস্তা দখল করে নির্মাণকাজ পরিচালনার বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক জাহিদ ইকবালকে ঘিরে একটি মব তৈরি করা হয়। সংবাদটি ছিল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। নগর জীবনে রাস্তা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা একটি গুরুতর সমস্যা এবং এ ধরনের অনিয়ম তুলে ধরা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সেই অনিয়মের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিককেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। তাকে ঘিরে ধরে চাপ সৃষ্টি করা হয়, অপমানজনক আচরণ করা হয় এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয় যাতে ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে নিরুৎসাহিত হন।

এই ঘটনা নতুন নয়; বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। কখনো অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশের কারণে, কখনো ভূমিদস্যুতা বা নদীভাঙন রোধ প্রকল্পে অনিয়মের প্রতিবেদন করার কারণে সাংবাদিকরা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংবাদ প্রকাশের পর একটি সংগঠিত গোষ্ঠী সাংবাদিককে ঘিরে ধরে হুমকি দেয় বা তাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা করে। কোথাও ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে, কোথাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, আবার কোথাও মিথ্যা মামলা বা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে একটি সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। যখন কোনো সংবাদ প্রভাবশালী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত হানে, তখন তারা যুক্তির পথে না গিয়ে শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নেয়। এই শক্তির প্রকাশ ঘটে দলবদ্ধ উপস্থিতির মাধ্যমে—যেখানে সত্য বা তথ্যের পরিবর্তে ভয় এবং চাপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যাকে আমরা মব সংস্কৃতি বলতে পারি।

মব সংস্কৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যুক্তির ভাষা বোঝে না। মব পরিচালিত হয় আবেগ, উত্তেজনা, গুজব এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থের ভিত্তিতে। সেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ধৈর্য থাকে না, নৈতিক বিচারবোধও প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। ফলে কোনো সমাজে যখন মব সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনতার তাৎক্ষণিক বিচার এক ধরনের অঘোষিত শক্তিতে পরিণত হয়।

গণতান্ত্রিক সমাজে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আইনের শাসন, যুক্তির সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর। কিন্তু মব সংস্কৃতি এই তিনটি ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। মবের উপস্থিতিতে যুক্তির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, আইনের শাসন অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। সাংবাদিকরা যখন ভয় ও চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসংযমের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তখন আর প্রকাশ পায় না। দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড সহজেই আড়ালে থেকে যায়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই, কারণ তারা প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘদিন সুস্থভাবে টিকে থাকতে পারে না। সাংবাদিকরা যখন নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তখনই সমাজে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে সাংবাদিকরা যদি হামলা, হুমকি বা মব সহিংসতার ভয়ে আতঙ্কিত থাকেন, তবে সত্য প্রকাশের অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের আলোকে সাংবাদিকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো সংবাদ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার জন্য আইনগত পথ রয়েছে। প্রতিবাদ পাঠানো যেতে পারে, সংশোধনের দাবি করা যেতে পারে, কিংবা প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসব পথ পরিহার করে মব তৈরি করে একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করা আইনের শাসনের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা।

এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের উপর হামলা বা মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ অপরাধীরা যদি মনে করে যে এসব ঘটনার কোনো শাস্তি নেই, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা না থাকলে মব সংস্কৃতি আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে সাংবাদিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা এই পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি। বস্তুনিষ্ঠতা, তথ্য যাচাই, পেশাগত নীতি ও সততার প্রতি কঠোর অঙ্গীকার সাংবাদিকতার ভিত্তিকে দৃঢ় করে। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে যথাযথ অনুসন্ধান নিশ্চিত করা সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত। কারণ সাংবাদিকতার শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই।

তবে এই কথাটিও মনে রাখতে হবে—সাংবাদিকতার ভুল থাকলে তার সমালোচনা বা সংশোধনের পথ রয়েছে। কিন্তু সেই ভুলের অজুহাতে মব তৈরি করে একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; বরং এটি সমাজের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।

নিকুঞ্জের ঘটনাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—আমরা কি সত্যকে যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে মোকাবিলা করব, নাকি জনতার ভয় দেখিয়ে তাকে স্তব্ধ করে দেব? যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একজন সাংবাদিক নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

ইতিহাস আমাদের বারবার একটি সত্য শিখিয়েছে—সত্যকে কখনো স্থায়ীভাবে দমিয়ে রাখা যায় না। তাকে যতই চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হোক, কোনো না কোনো সময় তা নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। তাই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন যুক্তির সংস্কৃতি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আন্তরিক সম্মান।

আজকের বাস্তবতায় আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে আছে মবের সংস্কৃতি—যেখানে উত্তেজনা ও শক্তি প্রদর্শন সত্যকে আড়াল করে দেয়। অন্যদিকে আছে আইনের পথ—যেখানে যুক্তি, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচার সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একটি সভ্য সমাজের জন্য দ্বিতীয় পথটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং এখনই সময় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। মব নয়, আইন; সহিংসতা নয়, যুক্তি—এই নীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ। এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন সাংবাদিক সত্য তুলে ধরার জন্য জনতার বিচারের মুখে পড়বেন না; বরং তার কাজকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে সম্মান করা হবে।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


দৃষ্টি প্রতিদিন

প্রকাশক ও সম্পাদক এসএম আমিনুল মোমিন, আইন বিষয়ক সম্পাদক, অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান


কপিরাইট © ২০২৬ দৃষ্টি প্রতিদিন । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত